ইকরা টেকনোলজিসকে নিয়ে দুই বন্ধুর স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া
ছবি: টেকভয়েস২৪

উজ্জ্বল এ গমেজ

কাজের সূত্রেই পরিচয়। কলিগ হিসেবে দুটি মনের আন্তরিকতায় গড়ে উঠে সখ্যতা। দুই পরিবারের যাওয়া আসা। তৈরি হয় পারিবারিক বন্ধুত্বের বন্ধন। সেই যে পথচলা শুরু আজ দুজনে সফল উদ্যোক্তা।

বলছিলাম ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোডাক্ট বিপণন ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ইকরা টেকনোলজিস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর রহমান ইমরান ও পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার কাজি মাহমাদুর রহমান রমির কথা।

দুই জনই চাকরি করতেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি)। ২০০৭ সালে আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে যোগ দেন আমিনুর রহমান ইমরান। ডাক নাম ইমরান। ইন্ডাস্ট্রিতে ইমরান ভাই বলেই সবাই ডাকেন।

২০১০ সালে সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগে সহকারী পরিচালক পদে বিটিআরসিতে যোগ দেন কাজী মাহমুদুর রহমান রমি। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজী মাহমুদ হিসেবে বেশি পরিচিত তিনি।

আইটি এবং সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগে কাজ করার সুবাদে পাশাপাশি থাকতেন দুজনে। সব সময় একে অন্যকে আন্তরিকভাবে যে কোনো কাজে হেল্প করতেন। উভয়ের মধ্যে গড়ে উঠে আন্তরিক সম্পর্ক। অন্যদিকে জন্মসূত্রে দুজনেই ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ায় একে অন্যের মধ্যে খুঁজে পান মনেরও মিল।

দুজনের মনে জন্ম নেয় বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের নামের নতুন আরেকটি সম্পর্ক। শুরু হয় দুই পরিবারের মধ্যে যাওয়া আসা। দুই পরিবারের মধ্যে তৈরি হয় পারিবারিক বন্ধুত্বের বন্ধন। এই পবিত্র বন্ধনকে আরো শক্তিশালী ও দৃঢ় করতে দুই পরিবার এক সাথে ভ্রমণে যান থাইল্যান্ডে।

ইমরান মানবিক বিভাগে আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পাশাপাশি এলএলসি থেকে হাইয়ার ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সায়েন্স পাস করেন।

ট্রান্সনেট সিস্টেমস লিমিটেডে যোগদানের মধ্য দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে শুরু হয় তার কর্মজীবন। পরে এইচআরসি টেকনোলজিস লিমিটেড এবং ইনটেক অনলাইন লিমিটেডেও কাজ করেন। সিস্টেম সাপোর্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন ড্যাফোডিল অনলাইন লিমিটেডে। এক সময় ভাগ্য পরিবর্তনে ট্র্যাক চেঞ্জ করেন এই ইঞ্জিনিয়ার।

পাবলিসার হিসেবে শুরু করেন অনলাইন নিউজপোর্টাল বাংলাটাইমস২৪.কম। বেশ কিছুদিন সুনামের সাথে চলে ইন্টারনেট পত্রিকাটি। বড় অংকের টাকাও ইনভেস্ট করেন। একটা সময় ভাবনায় রঙ লাগে। বদলে যায় তার মত। সিদ্ধান্ত নেন সব ছেড়ে চাকরি করার। সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে ( বিটিআরসি)। এরপরে ওই কাজেও মন ভরল না তার।

অন্যদিকে মাহমুদ মতিঝিল মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও ঢাকা স্টেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ভর্তি হন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। ড্যাফোডিল থেকে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) পাস করে বিটিআরসিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে শুরু হয় তারকর্মজীবন।

ইমরানের আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে দীর্ঘ দিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে চাকরির প্রতি একটা সময় বিতৃষ্ণা চলে আসে। ২০১২ সাল। দুই বন্ধুর ভাবনার মোড় নেয় নতুন দিকে। ভাবেন আইটি ইন্ডাস্ট্রির যে অবস্থা বিটিআরসিতে কাজ করলে কোনোদিন ভাগ্য বদল হবে না। শুরু হয় নতুন পরিকল্পনা। দুজনে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করার পরিকল্পনা করেন।

শুধু পরিকল্পনা করলেই তো হবে না। ব্যবসার জন্য চাই মোটা অংকের পুঁজি। দুজনে মিলে ব্যবসার পরিকল্পনা করে সে অনুসারে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সেই সাথে চলতে থাকে দুজনের চাকরি।২০১৩ সাল প্রস্তুতিতে চলে যায়। ২০১৪ সালে সেপ্টেম্বরে প্রথমে চাকরি ছাড়েন ইমরান এবং ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মাহমুদ।

মালোয়েশিয়াতে ট্রেডিং বিজনেস করার সিদ্ধান্ত নেন তারা। বিজনেস করার পরে পরিবার নিয়ে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকারও পরিকল্পনা করে ফেলেন। পরিকল্পনার বাস্তবায়নও করে ফেলেন দুমাসে। ২০১৫ সালে এপ্রিলে লাইসেন্স নিয়ে মালোয়েশিয়াতে ট্রেডিং বিজনেস শুরু করেন। পরীক্ষামূলকভাবে নিজ নিজ পরিবারকেও নেয়া হয়। সবার দেশ, পরিবেশ, সংস্কৃতি ভাল লাগলে থেকে যাবেন স্থায়ীভাবে। দুই মাস থাকার পর কারোরই ভাল লাগেনি। তাই পরিবার নিয়ে ফিরে আসেন নিজের দেশে।

ইমরানের ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোডাক্ট ব্যবসা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকায় এই সেগমেন্ট নিয়েই কাজ করার পরিকল্পনা করেন দুজনে। চীন ও হংকং থেকে ইন্টারনেট ও নেটওয়াকিং এক্সেসরিজ কিনে এনে প্রথমে নিজের বাসা থেকে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, অফিস কলিগ, পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাঝেই বিক্রি শুরু করেন। শুরু থেকেই বেস্ট কোয়ালিটির প্রোডাক্ট ও গুণগত মানসম্পন্ন সেবা দেয়ার দিকে নজর দিয়েছেন নতুন এই উদ্যোক্তা।

২০১৬ সাল। গুণগত মানসম্পন্ন সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে কাস্টমার ও ক্লায়েন্টরা অন্যদের রেফারেন্স দিতে থাকেন। ধীরে ধীরে কাস্টমার বাড়তে থাকে। পরে আইটি ইন্ডাস্ট্রির কাছের বড় ভাইদের অফিস ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনাও করা হয়। ২০১৭ সালও কেটে যায় এভাবে।

ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকলে একটা সময়ে করর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অর্ডার আসলে দুজনকে পড়তে হয়েছে বিপাকে। কেননা ক্লায়েন্ট ডিল করার জন্য চাই দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান। হঠাৎ করেই একজন ক্লায়েন্ট বলতেন ভাই আমার একটা এসপ্লাইসং মেশিন লাগবে। অফিসের ঠিকনাটা দেন তো। তখন জরুরি হয়ে ‍উঠে একটা অফিস নেয়াটা।

২০১৯ সালের জুলাইতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোড শেলটেক ভবনের চতুর্থ তলায় নেয়া হয় নিজস্ব অফিস। ব্যবসার প্রোডাক্ট সংক্ষণের জন্য ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নেয়া হয় আরেকটা নতুন অফিস।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রোডাক্টের কোয়ালিটি ঠিক রেখে ক্লায়েন্টদের গুণগত মানসম্পন্ন সেবা দেয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দুজনে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছে সংগ্রামী দুই উদ্যোক্তা।

ইকরা টেকনোলজিস লিমিটেড ফাইবার অপটিক পণ্য বাজারজাত ও বিপণন করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সারাদেশে ফাইবার অপটিক পিএলসি প্লিটার, ট্রান্সসিভার, এসপ্লাইসিং মেশিন, ওটিডিআর, অপটিক্যাল পাওয়ার মিটার, পোর্ট স্প্লিটার বক্স, এবিএস স্প্লিটার, পিএলসি স্প্লিটার, প্যাচ কোর্ড, অপটিক্যাল কেবল, টার্মিনাল বক্স, ফাইবার ডিস্ট্রিবিউশন বক্স, জিবন ওয়াইফাই অনু (রাউটার), এক্সপন ওয়াইফাই অনু (রাউটার), এসএফপি পন মডিউল, ওডিএফ, অপটিক্যাল পাওয়ার মিটার, ফাইবার সুইচ ইত্যাদি পণ্য সরবারহ করছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে এক ঝাঁক তরুণ মেধাবী আইটি সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার। সবাই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছেন।

দেশে সিগনাল ফায়ার টেকনোলজিসের একমাত্র ডিস্ট্রিবিউটর ইকরা টেকনোলজিস। প্রতিষ্ঠানটি সিগনাল ফায়ারের সব ধরনের পণ্য দেশে বাজারজাত করছে। রিচারলিংক, সাইরোটেক এবং সেনটার কোম্পানির বাংলাদেশের অথোরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

পাবলিক প্লেসে সুলভ মূল্যে প্রিপেইড সিস্টেমে ওয়াইফাই ব্যবহারের জন্য একটা নতুন প্রযুক্তি আনার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ইতোমধ্যে অন্যান্য আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ওয়াইফাই ব্যবহারের যেসব প্রযুক্তি এনেছে এটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী একটা প্রযুক্তি।এর মাধ্যমে খুব সহজেই যে কোনো মানুষ পাবলিক প্লেস থেকে পরিমাণ মতো টাকা পে করে নির্দিষ্ট জোনের মধ্যে ইচ্ছা মতো ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে। শিগগিরই আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে দুই বন্ধুর স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। তাদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ও তার তথ্যপ্রুযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা অংশীদার হতে চাই।

সারাদেশের মানুষের হাতে হাতে সুলভ ও সহজ পদ্ধতিতে ওয়াইফাই কানেক্টিভিটি পৌঁছে দিতে চাই।এর জন্য কাস্টমার, ক্লায়েন্টদের যতদূর সম্ভব সুলভ মূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন প্রোডাক্ট দিয়ে সর্বোচ্চ মানের সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...