পাটপ্রেমী ইব্রাহিম খলিলের জীবনের গল্প

উজ্জ্বল এ গমেজ

প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটা স্বপ্ন থাকে। কেউ উকিল, কেউ ডাক্তার, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার হতে চান। তবে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম একজন। গাঁও-গেরামের ছেলে। শুধু খেয়ে, পরে, ফুটবল খেলেই কাটতো শৈশবের দিনগুলো। জীবন নিয়ে তেমন কোনো স্বপ্ন ছিল না। সময়ের পালাবদলে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে নানান ঘাত-প্রতিঘাতে জীবন হয়ে উঠেছিল জর্জরিত। তবুও থেমে থাকেননি। এগিয়ে গিয়েছেন আত্মপ্রত্যয়ের সাথে। অবশেষে তিনি সাফল্যের মুখ দেখেছেন পরিণত বয়সে। তিনি এখন সবার কাছে পরিচিত মুখ। পাটপণ্য নিয়ে দেশের আলোচিত বিক্তত্ব।

বলছিলাম পাটপ্রেমী এবং পাটপণ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ক্রাফটভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিলের কথা। পাট নিয়ে কার্যক্রমের সংগঠন ‘পাটের লড়াই’ এবং ‘পাটের জন্য ভালোবাসা’-এর প্রতিষ্ঠাতা ই-ক্যাব সংগঠনের রুরাল ই-কমার্স স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

আত্মপ্রত্যয়ী ও সংগ্রামী এই পাটপ্রেমী উদ্যোক্তার সফলতার পেছনে রয়েছে অনেক ঘটনা। অসংখ্যবার ব্যর্থ হয়েও দমে যাননি। বারবার কঠিন আঘাতেও ভেঙে পড়েননি। দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন অদম্য ও অধ্যবসায়ী এই জীবন যোদ্ধা। আজ তিনি সফল। তিনি একজন প্রশিক্ষক। প্রতিমাসে নিজের প্রতিষ্ঠানে ‘বহুমুখী পাটপণ্য উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ’ দিয়ে থাকেন। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের অনেক তরুণ-তরুণী আজ সফল উদ্যোক্তা।

১৯৬৫ সালে নোয়াখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম ইব্রাহিম খলিলের। দুই বোন ও সাত ভাই। বাবা রাজধানীর ফকিরের পুলের ব্যবসায়ী। মা গৃহিনী। স্ত্রী ও ভার্সিটি পড়ুয়া দুই মেয়ে নিয়ে সুখের পরিবার তার। বর্তমানে পরিবার নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরের নবোদয়ে নিজের বাড়িতে বসবাস করছেন।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আবিরপাড়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কমার্স বিভাগে এসএসসি এবং পুরান ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ঢাকা টিঅ্যান্ডটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পাস করেন বিকম।

কলেজ জীবনের স্মৃতিচারণ করে ইব্রাহিম খলিল বলেন, এসএসসি পাস করে ভালো কলেজে পড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাবার কাছে আসি ঢাকা শাহজানপুর। এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় পারিবারিক কিছু জটিলতার কারণে রাগ করে শাজাহানপুরে বাবার তিনতলা বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। গিয়ে উঠি শহীদবাগ মসজিদের মেসে। শুরু হয় ১৭ বছরের একটা অজপাড়া গাঁয়ের ছেলের কষ্টের জীবন। এভাবে বাস্তবতার সাথে যুদ্ধ করে নাইট সেশনে বিকম পাস করি ঢাকা টিঅ্যান্ডটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে।

এবার সোনার হরিণ চাকরি খোঁজার পালা তার। এক বন্ধুর সহায়তায় চিটাগাংয়ে একটা কটন মিলে ছোট একটি চাকরি মেলে। কিন্তু শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে বেতন কম দেয় দেখে প্রতিবাদ করে চাকরি হারান তিনি। ফের এক ডাক্তার বন্ধুর সহযোগিতায় ট্রেডভিশন লিমিটেডে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হিসেবে কাজ পান। পাশাপাশি এক বন্ধুর কম্পিউটার দোকানে কম্পিউটার শেখা শুরু করেন। চাকরির জন্য যেসব প্রোগ্রাম জানা দরকার (তখন ছিল ওয়াড স্টার, লোটাস, ডিবেস) সবগুলো শেখেন ১৯৮৭ সালে।

এরপর গণসাহায্য সংস্থা জিএসএস-এতে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন ২ হাজার ৬৬০ টাকা বেতনে। কাছের এক বন্ধু চাকরি করতেন সিমেন্স কোম্পানিতে। তার ভালোবাসা এবং সহযোগিতায় ঢাকা শহরে থাকা খাওয়া ফ্রি হয়ে যায় বছরের পর বছর। বেশি বেতনের আসায় কম্পিউটার শেখানো সেই বন্ধুর সহযোগিতায় হুন্ডাই কনস্ট্রাকশন লিমিটেডে (যমুনা মাল্টিপারপাস ব্রিজ)-এর ডাটাএন্ট্রি অপারেটর হিসেবে কাজ পান।

বন্ধুদের ভালোবাসায় সিক্ত ইব্রাহিম বলেন, সবার জীবনে এরকম কিছু বন্ধু খুব দরকার। আমি চিরজীবন কৃতজ্ঞ এসব বড় মনের বন্ধুদের কাছে।

জীবন চলছিল আপন গতিতে। বেশ কিছুদিন কাজও করেন সেখানে। এরপর এলজিইডির একটি প্রজেক্টে নতুন চাকরি পান ফরিদপুর জেলার রাজবাড়ীতে। জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। সুযোগ-সুবিধা, বেতন সব মিলে ভালো ছিল চাকরিটা। তখন ১৯৯৬ সাল। জীবনকে আরো সুন্দর করে সাজাতে বিয়ে করেন। নতুন সংসার, নতুন জীবন শুরু হয় তার।

ইব্রাহিম বলেন, আমি তখন এলজিইডির অধীনে সুইডেন ও নরওয়ের একটা প্রজেক্টে কাজ করি। একদিন প্রজেক্ট ভিজিটে গিয়ে দেখতে পাই সুইডিশ এক ভদ্রলোক লুঙ্গি বোনার তাঁতকে কিছু বদলিয়ে পাটের সুতা দিয়ে এক ধরনের মোটা কাপড় বুনে তা থেকে হাত পার্স, মানি ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ ও স্কুল ব্যাগ তৈরি করছেন।

তখন তার মাথায় আসে ব্যবসার নতুন আইডিয়া। ভাবেন প্রজেক্টের চাকরি তো দুদিন পর শেষ হয়ে যাবে। তখন কী করে চলবো? নিজে থেকে কিছু করার সময় এখনই। যে ভাবনা, সেই কাজ। তখন ওই কাজগুলোর কয়েকটি স্যাম্পল এনে ঢাকার আড়ংকে দেখান। কর্তৃপক্ষ সেগুলো ভীষণ পছন্দ করেন। তার স্বপ্নে যোগ হলো নতুন পালক। দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন সংগ্রামী এই মানুষটি।

ব্যবসা করার পোকা মাথায় ঢোকায় ১০ দিনের মধ্যে ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে নরসিংদীতে একজন তাঁতী ঠিক করেন। প্রজেক্টের তিন বসকে পার্টনার নিয়ে শনির আখড়ায় দুই রুমের বাসা নিয়ে শুরু করেন পাটের ব্যাগের কারখানা। নরসিংদীতে বসানো হয় গামছা বুনানো অদি তাঁত। ইমামগঞ্জ থেকে ৯ কেজি ওজনের ১টা পাটের সুতা কিনে নিয়ে আসেন। এদিকে ৩/৪ মাস আগেই বিয়ে করেছেন। নতুন সংসার। কাজের এতো বেশি চাপ যে বউ তাকে খুঁজেই পেতেন না।

বিজনেসের প্রথম রাতের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ইব্রাহিম খলিল বলেন, সারা রাত বসে বসে পানিতে সুতা জাল দেই, কিন্তু সুতা ব্লিচ হয় না। অবশেষে ফজরের আজানের আগে আগে সুতা সাদা হওয়া শুরু হয়। ওই রাত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাত। রাজবাড়ী পাংশায় যে বীজ লাগিয়েছি, দেখছি তার চারা গজাতে শুরু করে। উদ্যোক্তা শব্দের মধ্যেই মনে হচ্ছে কাউকে বেঁধে রাখছে। সে বের হতে চাচ্ছে। তার অন্য একটা রূপ হলো বীজ থেকে অংকুর বের হওয়া। এর জন্য দরকার কর্ম নেশায় নেশাগ্রস্ত হওয়া।

ওই যে নরসিংদী পাটের ময়লা সুতাকে সাদা করলেন, আস্তে আস্তে জীবনে সমস্ত ময়লা দূর করে সাদা করে ফেললেন তিনি। তারপর থেকে আর একদিনও থেমে থাকেনি কর্ম। প্রতিদিন সকালে ব্যাগে করে হাত পার্স, মানি ব্যাগ, লেগিংস ব্যাগ ও স্কুল ব্যাগ নিয়ে পথে পথে ফেরি করতেন। এভাবেই চলতে থাকে দিনগুলো। তখন নিউমার্কেটে কয়েকটি দোকান, কারিতাস, কারিকা, বুনন আড়ং, গ্রামীণচেকে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো এধরনের মাল রাখতো। প্রথম শনির আখড়ায় গ্রীন বাংলা ক্রাফট (জিবিসি) নামে ব্যবসা চালু করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে টানা তিন বছর বাণিজ্যমেলায় স্টল নেন ভালো চলছিল ব্যবসা।

জিবিসি যখন এগিয়ে যাচ্ছিল তখন বড় ধাক্কা খান স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। প্রজেক্টের যেসব বসদের নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তারা এখন তাকে পার্টনার করবে না। ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে হবে। তিনি ওনাদের সম বয়সী বা সম শিক্ষত না। মনের দুঃখে ছেড়ে দিলেন নিজের হাতে তিল তিল করে গড়া প্রতিষ্ঠান জিবিসি।

আবার শুরু হয় একা পথচলা। হতাশ হলেও আশা ছাড়েননি। ঘুরে দাঁড়াতে ট্রেডভিশনের এমডি ওই ডাক্তার বন্ধুর কাছে সব খুলে বলেন। ওই বন্ধু পার্টনারদের সাথে যৌথভাবে মেডিকেল যন্ত্রপাতির ব্যবসা করতেন। সব কথা শুনে বন্ধু তার পার্টনারদের সাথে আলাপ করেন। পরে নতুন একটি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করে লিমিটেড করার জন্য তাকে ১০ হাজার টাকা দেন। একরাতের মধ্যে বন্ধুর কোম্পানি ট্রেডভিশনের সাথে মিল রেখে কোম্পানির নাম ‘ক্রাফটভিশন’ ঠিক করে বন্ধুর অফিসে যান। শর্ত জুড়ে দেন ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নিতে হবে ইব্রাহিমকেই। ‘ক্রাফটভিশন’ চার জন পার্টনার নিয়ে লিমিটেড কোম্পানির যাত্রা শুরু ১৯৯৮ সালে ১৫/১৭ শান্তি নগর বাজার থেকে।

নতুন রূপে যাত্রা শুরু হয় অংশীদারীত্বের ব্যবসার। নতুন মোড় নিলো ব্যবসার। সবার পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে থাকে ব্যবসা। সারাদেশে ঘুরে ঘুরে আড়ং, গ্রামীণ চেক, কারিকা, বুনন, কারুপল্লীসহ সব নাম করা শো-রুমগুলোতে নিজেরদের তৈরি পণ্য দিতে থাকেন। সারাদেশে যখন যেখানে বড় কোনো উদ্যোক্তা মেলা হয়েছে সেখানেই অংশগ্রহণ করেন। শোরুমে Export Promotion Bureau-এর Display Board-এ মাল রাখেন যদি কোনো বিদেশী ক্রেতার নজরে পড়ে। হ্যাঁ, পড়লো এক জনপ্রিয় দেশী-লেদার কোম্পানি ক্রাউন লেদারের স্বত্বাধিকারী সিরাজ ভাইয়ের চোখে।

আত্মপ্রত্যয়ী এই উদ্যোক্তা বলেন, কোম্পানিকে এগিয়ে নিতে পরামর্শের জন্য সিরাজ ভাইয়ের কাছে যাই। উনি খুবই ভালো একজন মানুষ। রাস্তা দেখিয়ে দিলেন কীভাবে বিদেশী অনুদানে দেশীয় পণ্য বিদেশে নেয়া যায়। উনার দিক-নির্দেশনায় দুই দফা গ্রান্ট পেলাম ২০০১ এবং ২০০৩ সালে। দুই-বারই জার্মানিতে মেলায় যাই। এছাড়াও বেলজিয়াম, ন্যাদারল্যান্ড, ফ্রান্স, লন্ডন, দুবাই, দিল্লি অটম ফেয়ারসহ ঘুরি অনেক দেশে। পাটপণ্য নিয়ে যাই বিশ্বের নয়টি দেশে।

২০০১ সালে যখন সরকার পলিথিন বন্ধ করলো তখন বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী শাজাহান সিরাজ- উনি একটা ফোরাম করে দিলেন। পলিথিনের বিকল্প পাটের ব্যাগের ফোরাম করে এই উদ্যোক্তাকে সচিব আর সভাপতি করলেন এক সাবেক যুগ্ম সচিবকে। এই উদ্যোক্তার পথচলা থামেনি এক দিনের জন্যেও। কিন্তু যখন সরকার দেশের সবচেয়ে বড় আদমজী পাট কল বন্ধ করে দিলেন, যখন একে একে আরো পাট কল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন ভাবনায় পড়ে যান তিনি।

এদিকে এক সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে পলিথিনের মালিকদের রোষানলে পড়ে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে এই উদ্যোক্তার। শেষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার সব কিছু ছেড়েছুড়ে ছোট দুই মেয়েকে রেখে নীরবে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে দেশ ছেড়ে চলে যান ইংল্যান্ডে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন আর কোনো দিন এই দেশে ফিরে না আসার।

দশ বছর বউ বাচ্চা নিয়ে সেখানে থাকেন। কাজ করেন অন্তত ১২-১৪টি রেস্টুরেন্টে। একটা সময় মেইন শেফ হন। সাদা মানুষগুলো তার রান্না খাবার খেয়ে হাতে চুমু খেতেন। অন্যদিকে ভেতরে ভতরে তার দেশের জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। বাবার মৃত্যু হয়। দেশে আসতে পারেননি। মাঝে মাঝে মায়ের অসুস্থতার খবরে বুকের পাঁজর ভেঙে আসে।

জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে তার নিজের ও শরীর খারাপ হতে থাকে। দেশের টানে আর টিকতে না পেরে অবশেষে পরিবার নিয়ে ফিরে আসেন যাদুর নগরী ঢাকায়। এবার চ্যালেঞ্জটা তার জন্য আরো বড়। মেয়ে দুটি বাংলা ভুলে গেছে। তাদেরকে স্কুলে ভর্তি করতে হয়। তাছাড়া লম্বা সময় ঠাণ্ডার দেশে থাকায় যান্ত্রিক নগরীর প্রচণ্ড গরম, শহুরে মানুষের চালাকি, সব মিলে রাজধানীতে চলা-ফেরা করাই মুশকিল হয়ে যায় তার।

একদিন রাজধানীর মোহাম্মদপুর জাপান গার্ডেনসিটির রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন ইব্রাহিম। হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় একটা লম্বা লাইনের দিকে। মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে জানতে পারলেন লোকগুলো গাড়ির টিকিট হাতে নিয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে। বিষয়টা তার চিন্তায় প্রভাব ফেলে। ভাবেন, না এখন দেশে কিছুটা শৃঙ্খলা হয়েছে। তাহলে ব্যবসাটা এগিয়ে নেয়া যাবে, মেয়েদের ভর্তি যুদ্ধের পর আবার জীবন যুদ্ধ। তিনি ভাবলেন এই জন্যই আমাদের দেশের মানুষ বিদেশে কোনো ভাবে যেতে পারলে আর ফিরে আসে না।

সময়টা তখন দেশের ই-কমার্সের জাগরণের। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট রাজিব আহমেদ দিন-রাত নানান কার্যক্রম করছিলেন। এসব দেখে তখন তার মনের ভেতর সেই ঘুমন্ত উদ্যোক্তাটি আবার জেগে উঠে। এদিকে বিদেশে যাওয়ার সময় ‘ক্রাফটভিশন লিমিটেড’ কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে যান।

পার্টনারশিপ ব্যবসাটা তার জন্য সুখকর নয় দেখে সিদ্ধান্ত নেন লিমিটেড কোম্পানি থেকে শুধু ‘ক্রাফটভিশন’ করে নিজে ব্যবসাটা এগিয়ে নেয়ার। আবারো ঘুরে দাঁড়ান স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। ‘ক্রাফটভিশনে’র পুরনো ম্যানেজারের সহযোগিতায় নতুন করে সব শুরু করেন। ধারাবাহিকভাবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাপান, ডেনমার্ক এবং সুইডেনেসহ ১০/১৫ দেশের সাথে নিয়মিত পরিবেশবান্ধব পাটের তৈরি দেশি পণ্য রপ্তানি করতে থাকেন।

অধ্যবসায়ী এই উদ্যোক্তা বলেন, পাট নিয়ে কাজ করে সারা জীবন কাটিয়ে দিলাম। তবুও এখনও মনে হয়। পাট নিয়ে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। বহুমুখী পাটপণ্যকে যত বেশি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাবে, পাট শিল্পের সুদিন সম্ভাবনা তত বাড়বে। দেশের অর্থনীতিতেও তখন পাটের গুরুত্ব আবার বাড়বে।

দেশের সোনালী আঁশ পাট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে ইব্রাহিম বলেন, পরিবেশবান্ধব ও দেশি পণ্য বলে পাটপণ্যের কদর দেশে কম; কিন্তু বিদেশে অবিশ্বাস্য চাহিদা। পাটের তৈরি এসব পণ্য দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত। হাতের কাছেই মেলে উপকরণ। খুব বেশি যন্ত্রপাতি লাগে না। অল্প পুঁজিতে শুরু করতে চাইলে সেলাই মেশিন হলেই চলবে। কাঁচামাল হিসেবে লাগবে পাট, পাটের চট, সুতা ও রং। পণ্য তৈরির জন্য দক্ষতা থাকা চাই, এই জন্যে নিতে হবে প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ দেয় অথবা পাটপণ্য তৈরি করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যেমন, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন, জেডিসিসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান।

নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি তিনি কর্ম জীবনে মাত্রা (অ্যাডভার্টিসিং ফার্মে) অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাকাউটেন্ট, সোনার কটন মিলস (বাংলাদেশ) লিমিটেডে প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট, বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার, হিফাব ইন্টারন্যাশনালের এবি-এর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নটাকে ছোটবেলার সাইকেল চালানোর সাথে তুলনা করেন পাটপ্রেমী এই উদ্যোক্তা। তিনি বলেন, ছোটবেলায় কতবার-ই না পড়ছেন সাইকেল থেকে। পা কেটে গেছে। হাতে ব্যথা পেয়েছেন। কিন্তু আপনার খেয়াল হল আপনি শিখবেন আর এটাই হলো নেশা। এটাই হলো একজন উদ্যোক্তার রোগ নির্ণয়। এই নেশাকে পুঁজি করে যেকেউ কোনো সময়োপযোগী সমস্যাকে সমাধানের জন্য কাজ করলে নিশ্চিত সফল হবেনই।

উদ্যোক্তা হওয়া এক ধরনের নেশার মতো বা রোগের মতো। আর তার প্রথম লক্ষণ হলো উদ্যমী হওয়া। এই মানসিক রোগটা যার যতো বেশি, সে ততবেশি উদ্যোগী, ততবেশি সফল। এটা সহজ এবং সরল একটা অংক। উদ্যোক্তা হতে হলে আপনার প্রচণ্ড কর্মনেশা থাকতে হবে। আর ঝুঁকি নিতে জানতে হবে। জীবনের শিক্ষা থেকে বললেন সংগ্রামী এই উদ্যোক্তা।

আজ এই অবস্থানে আসার পেছনে যাদের অবদান রয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান ইব্রাহিম। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নিজের স্নেহময়ী মায়ের প্রতি। যার আদর্শ নিয়ে সংগ্রামের দিনগুলোতে তিনি ধ্বংস হয়ে যাননি। আজকে ইব্রাহিম খলিলকে সবাই ব্র্যান্ড হিসেবে চেনে। এ অবস্থানে আসতে যে দুইজন ব্যক্তি বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন তারা হলেন মা ও বাবা। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞ তিনি। যে বন্ধুদের আশ্রয়ে দিনের পর দিন বেকার থাকাবস্থায় থেকেছেন, চাকরি করেছেন যাদের সাথে তাদের প্রতিও প্রাণভরে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

খলিল বলেন, আগে পাট দিয়ে শুধু বস্তা বা এই জাতীয় পণ্য তৈরি হতো। এখন পাটের বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে। এখন আমরা পাটের পলি ব্যাগ, জুতা, বিভিন্ন ধরনের খেলনাসহ নিত্যপ্রয়োজনী সব পণ্য তৈরি হচ্ছে। হস্তশিল্পীদের হাতে তৈরি হচ্ছে প্রায় জানা-অজানা তিন শতাধিক পণ্য। খাদ্য পণ্য হিসেবেও অনেক ধরনের ব্যবহার হচ্ছে পাট। এক সময় সিংহভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস আমাদের দেশের উৎপাদিত পাট।

পাট তন্তু (আঁশ) জাতীয় উদ্ভিদ যা বিদেশে রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করায় সোনার সাথে তুলনা দিয়ে বলা হয় আমাদের দেশের সোনালী আঁশ। বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী দেশ। আজ তা অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। আমি স্বপ্ন দেখি এ হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার। আর এই জন্যই এই বয়সে এতো পরিশ্রম করছি। এ লাড়াইয়ে জেতা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন সবার সযোগিতা। (লেখাটি বিবার্তায় প্রকাশিত)

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...