এক রাতের হিমু
ছবি: সংগৃহীত

সীমান্ত পিটার গমেজ

বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছি। সবকিছু ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢেকে আছে। ঘোর আমাবস্যার রাত, বিদ্যুৎ নেই। চোখ খোলা রাখি বা বন্ধ অন্ধকারটা ছাড়া বাকি সব কিছুই এখন অদৃশ্য।

মাথায় একটা গানের দুইটা লাইন নাচানাচি করছে, ‘না, না ঘুম নাই চোখে, সে তো বালিশের দোষ না’। গানের লেখকের নাম ঠিকানা জানা থাকলে ঘুম না আসার কারণটা জিজ্ঞাসা করে আসা যেত। মনে হচ্ছে নিঃশ্বাসের সাথে নাক দিয়ে অন্ধকার শ্বাসনালীতে ঢুকে দম বন্ধ করে দিচ্ছে।

বিছানা থেকে নেমে আলনা থেকে হলুদ পাঞ্জাবিটা গায়ে জরিয়ে নিলাম। মোবাইলা মানিব্যাগ সব ঘরে রেখে দরজার কাছের জীর্ণশীর্ণ সেন্ডেল জোড়া পায়ে দিয়ে বের হয়ে এলাম বাসার গলিতে।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: ক্ষুধা

রাত দুটো বাজে হয়তো। সুনশান-নিস্তব্ধ রাস্তা, গা হিম করা একটা মিচকে বাতাস কানের নিচ দিয়ে একটা ঠাণ্ডা ছোঁয়া দিয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা একটা অনুভূতি উঠা-নামা করছে। নাহ! বেশ ভালো শীত লাগছে। কোথাও একটা চাদর পেলে মন্দ হতো না।

গলি থেকে বের হয়ে মোড় ঘুরতেই একদল কুকুর ঘিরে ধরলো। কুকুরের ডাকাডাকিতে কান ঝালাপালা। লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে একটা পুলিশ ভ্যান ক্যাচ শব্দ করে আমার পাশে থামলো। কুকুরগুলো ভয়ে পালিয়ে গেল। ভ্যান থেকে গাট্টাগোট্টা কিসিমের একজন আর বিলেতি টর্চ লাইটের মত সরু সাইজের একজন পুলিশ নেমে এল। গাট্টাগোট্টা পুলিশটা হুংকার দিয়ে বললো,

ওই ছেমরা, এতো রাইতে এইহানে কি?
রাইত আর দিন কি সাহেব আমি সবসময় রাস্তায়ই থাকি।
তোরে দেইখা তো রাস্তার মনে হয় না, মনে হইতাছে ভদ্রঘরের পোলা।
কন কি সাহেব, দুনিয়াডা তো আল্লাহর বানাইন্না, উপরে আকাশ নিচে মাডি, এইডাই তো আমার ঘর, আল্লাহর বানাইন্না ঘর কি আর অভদ্র ঘর হয় নাকি?
ওই টোঙ্গা, সার্চ কর তো হালারে, জববর ফেচর ফেচর করতাছে।
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম, ‘টোঙ্গা’ লোকটা দেখতে যেমন বিলেতি টর্চ লাইটে মত সরু নামটা তেমনি সরু।

গাট্টাগোট্টা পুলিশটাও এগিয়ে এলো, প্রচণ্ড রেগে আছে। আমার নাক সোজা সাই করে ঘুসি চালালো। আমি মাথা নিচু করে ফেললাম। ঘুষি গিয়ে লাগলো টোঙ্গা মিয়ার কপালে। মনে হলো টোঙ্গা সাহেব টুং করে মাটিতে পরে গেল। টোঙ্গা বেহুশ হয়ে গেছে।

গাট্টাগোট্টা পুলিশ সাহেব টোঙ্গাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এ সুযোগে আমি আরেক গলিতে ঢুকে গেলাম।
চাচা, ও চাচা।
বদমাইশ, এতো রাইতে আইয়া মাইয়া মাইনষেরে চাচা চাচা ডাকতাছস্। মতলব কি তর?
মাফ কইরা দেন চাচি। রাইতের বেলায় ফুটপাতে মাইয়া মানুষও শুইয়া থাকবো ভাবি নাই। আপনে ঘুমান চাচি।

ওই পোলা, খাড়া। এতো রইতে মাইনষেরে ডাকাডাকি করতাছস্ কেন, কি হইছে?
তেমন কিছু না চাচি, সিগারেট লাগবো একটা।
বিড়ি হইলে চলবো? কলিম বিড়ি, আমাগ ধবলডাঙ্গার নামকরা বিড়ি।
কি কন চাচি! আপনে বিড়ি খান?
না আমি খাই না, তর চাচায় খায়।
দেন একটা বিড়ি দেন। চাচির কাছ থেকে কলিম বিড়ি নিয়ে লম্বা একটা টান দিলাম।
চাচা কই চাচি?
জানি না রে বাপ। ভিক্ষা করতে করতে কই যায়গা তার ঠিক নাই, আহে এক দুই সাপ্তাহ পর পর।
চাচি আর দুইডা বিড়ি দিবেন?
এই ল, পুরা প্যাকেটটাই লইয়া যা। এত রাইতে মাইনষেরে ডাকাডাকি করিছ না, ধইরা মাইর দিব।

চাচির কাছ থেকে বিড়ির প্যাকেটটা নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। জানি না কি কারণে আজ এভাবে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি। হঠাৎ এই খেয়াল কেন মাথায় এলো তাও জানি না। নাকি কয়েকদিন ধরে হুমায়ুন আহমেদ স্যারের হিমু উপন্যাসগুলো পড়তে পড়তে হিমুর চরিত্রের সাথে নিজেকে গুলিয়ে ফেলছি।

কয়টা বাজে জানি না। প্রত্যেকদিন ভোরবেলা মা এসে আমার ঘর থেকে ঘুরে যায়। আজ যখন ঘরে গিয়ে দেখবে আমি নেই তখন কেমন করবে!
দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি একটা মাঝ বয়সি লোক তীক্ষ্ণ নজরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। পিছনে একটা ধারালো ছুরি লুকানোর চেষ্টা করছে।

ল্যাম্পপোস্টের আলো ছুরিটাতে পরায় ছুরিটা চিকচিক করছে। কেন জানি একটুও ভয় লাগছে না। হয়তো সাথে হারানোর মতো কিছুই নেই তাই। হ্যাঁ, এটাই সত্য।

যখন আমাদের কাছে হারানোর মত কিছু থাকে তখনই আমরা ভয় পাই। কাছাকাছি যেতেই লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
ধারালো ছুরিটা আমার সমানে নাচাতে নাচাতে বললো,
যা আছে সব বাইর কর।
আমার খুব হাসি পাচ্ছে।
আমি পকেটে হাত ঢুকিয়ে পকেট থেকে বিড়ি বের বললাম, ভাই চাচির দেওয়া এক প্যাকেট কলিম বিড়ি ছাড়া আর কিছু নাই।
ধবলডাঙ্গার নামকরা বিড়ি।
আমি খাইছি, খুব মজা আপনেও একটা খান।

চুপ শালা, মজা করস আমার লগে? ছুরি দেখছস্, ভুঁড়ি ফুটা কইরা দিমু কইলাম।
ভাই সত্যি, বিড়ি ছাড়া আমার কাছে কিছু নাই।
আপনে চেক কইরা দেখেন।
লোকটা আর চেক করলো না।
পাশের ফুটপাতের ওপর বসলো।
আমিও তার পাশে বসলাম।
বিড়ির প্যাকেট এগিয়ে দিলাম।
নেন ভাই একটা বিড়ি খান।
নাহ, আমি বিড়ি খাই না।

কি কন ভাই, ছিনতাই করেন বিড়ি খান না এইটা কোন কথা।
হ এইডাই কথা, আগে যহন বিড়ি খাইতাম তহন ছিনতাই করতাম না, এহন ছিনতাই করি বিড়ি খাই না।

আপনার বউ হাসপাতালে। কঠিন রোগে ধরছে, তাই না? কথাটা বলে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। অবচেতন মনে কি আবারো হিমুর চরিত্রে ঢুকে গেছি?
হ, কিন্তু আপনে জানলেন কেমনে?
আমি অতীত ভবিষ্যৎ অনেক কিছু কইতে পারি।
লোকটা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আমাকে বিশ্বাস করবে কিনা ভেবে পাচ্ছে না।
এইবার আমি আন্দাজে ঢিল মারলাম, আপনার বউয়ের গর্ভের সন্তান নষ্ট হইয়া গেছে চার মাস আগে।

লোকটা আশ্চর্য চোখে আমার দিকে তাকালো, ওর চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার দ্বিতীয় কথাটাও সত্যি হয়ে গেছে। সে এখন আমাকে পীর ফকির ভাবতে শুরু করেছে।
তার চোখে পানি, চোখ মুছতে মুছতে বলতে শুরু করলো,
আমার নাম সুমন। আগে অনেক বিড়ি খাইতাম।
দিনে দুই প্যাকেট বিড়ি লাগতো। বউয়ের পেডে বাচ্চা আইলো।
আমি ঘরে বইয়াই বিড়ি খাইতাম। বউ কত কইতো বাইরে গিয়া বিড়ি খাইতে। আমি হুনতাম না।

একদিন বউয়ের পেডে যন্ত্রণা শুরু হইলো। হাসপাতালে লইয়া গেলাম, ডাক্তার কইলো বিষাক্ত ধুমার লাইগ্যা বাচ্চা নষ্ট হইয়া গেছে আর বউয়ের ক্যান্সার ধরা পরছে।
আল্লাহ আমার পাপের শাস্তি আামার বউ বাচ্চারে দিছে।
হেই দিন থাইক্কা বিড়ি খাওয়া ছাইড়া দিছি।
বউয়ের চিকিৎসার লাইগ্যা অনেক টেকার দরকার। তাই সারাদিন কাম করি আর রাইতে ছিনতাই।

আমি উঠে হাঁটতে শুরু করলাম, সে পিছন থেকে ডাক দিল,
ভাইজান।
আমি দাঁড়ালাম।
ভাইজান আপনে আমার বউয়ের জন্য দোয়া কইরা যান। আপনে দোয়া করলে আমার বউ ভালো হইয়া যাইবো।
আইচ্ছা, আপনের বউয়ের লাইগ্যা মন থেকে দোয়া কইরা দিলাম।
সামনের পূর্ণিমার রাইতে ফজরের আজানের সময় নৌকায় কইরা আপনার বউরে লইয়া নদীতে যাইবেন।
এই সময় ফেরেশতারা দুনিয়ায় ঘুরতে আহে। পূর্নিমার চান্দের আলো গায়ে মাখলে আর ফেরশতাগো ছোঁয়া পাইলে তোমার বউ ভালো হইয়া যাইবো।
ঠিক আছে ভাইজান বউরে লইয়া যামু, আমি জানি আপনে যেইডা কইবেন হেইডাই সত্যি হইবো।

ভাইজান আপনের নাম?
আমি হিমু।
আর পিছনে ঘুরে তাকালাম না, হাঁটতে শুরু করলাম বাসার দিকে।
মনে হচ্ছে সুমন মিয়া আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সে এক বিরাট গোলক ধাঁধাঁয় পড়ে গেছে।
চারিদিকে আলো ফুটে উঠেছে পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারিদিক। শুধু আমাদের বাড়িটাতেই থমথমে ভাব।

গেট খুলে ভিতরে ঢুকতেই মা ছুটে এসে জাপটে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করে দিলো।
কোথায় ছিলি সারারাত তোর কিছু হয়ে গেলে আমি কি নিয়ে থাকবো?
মার কোন কথাই যেন আমার কানে যাচ্ছে না।
মনে শুধু সুমন মিয়ার কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে।
সুমনের বউ ভালো হবে তো? আর আমার ভবিষ্যৎ বাণী?
আমি একরাতের হিমু।
একরাতের হিমুদের কথা সত্যি হয় কিনা কেউ জানে না এমনকি হিমুরাও না।

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...