কোনটা ভাল লোক দেখানো সংসার, নাকি আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচা?
লেখক সুরাইয়া শারমিন

সুরাইয়া শারমিন

শিক্ষিত চাকরিজীবী নারী যদি তার হাসবেন্ডের সব নোংরামি মেনে নেয়। শুধু মাত্র লোকে কি বলবে? বা অন্যকে দেখানোর জন্য সে সুখী? বা বাচ্চার অজুহাতে, এখন কথা হলো সেই বাচ্চটা যদি হয় ছেলে, তখন সে তার বাবার নোংরামি থেকে কি শিখবে?

সেও একদিন আর একজন নারীর সাথে সেই একই আচরণ করবে এবং ভাববে আমার মা তো আমার বাবার অন্যায় মেনে নিয়েছিলো। তবে আমার স্ত্রী কেন মানবে না?

আর যদি হয় মেয়ে শিশু, তবে সে বড় হবে তার আত্মমর্যাদা বোধহীন মায়ের কাছ থেকে এই শিক্ষা পেয়ে যে, নারী হলে সব কিছু মানিয়ে নিতে হয়। নিশ্চয়ই সেই আত্মমর্যাদা হীন নারী নিজে অসন্মানের জীবনযাপন করে তার বাচ্চাকে শেখাতে পারবে না আত্ম- সন্মান কি জিনিস?

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন : সম বণ্টন

আমার নিজের দেখা কিছু পরিবারের কথা বলতে পারি, আমি নিজে দেখেছি যে পরিবারের বাবা তার মায়ের গায়ে হাত তুলে, সেই পরিবারের সন্তানও ঠিক একই কাজ করে। সেও তার বউয়ের গায়ে হাত তুলে। কারণ সে তার ছেলেবেলায় ঠিক এই কাজটি তার বাবাকে করতে দেখেছে।

আবার সেই বাবার সব কথা তাকে মানতে বাধ্য করেছে। তার মা, শুধু মাত্র ছেলেমেয়ে কখনো পিতামাতার দোষ ধরতে পারবে না, এটাই আমাদের সমাজের নিয়ম। একজন মা কখনোই তার সন্তানকে তার পিতার খারাপ আচরণগুলোকে যে আসলেই খারাপ তা শেখান না।

আমি মনে করি একজন অভিবাক বলতে মা-বাবা দুজনেই হবে। সে তার অনেক অন্যায় আচরণ তার নিজ ঘরে, তার সন্তানদের সামনে করে, তখন একজন মায়ের বা বাবার দায়িত্ব সেই অন্যায় আচরণটা যে অন্যায় তা তার সন্তানকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দেওয়া।

এবং সেই সাথে এটাও বলা তোমার বাবা, বা তোমার মা আমার সাথে যে আচরণটা করেছে তা ঠিক করেনি। এই আচরণের কারণে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু অনেক বিষয় নিয়ে সন্তান বাবার মুখোমুখি হতে পারে না একটা বয়স পর্যন্ত। এই একই আচরণ তুমি কখনো তোমার স্ত্রীর সাথে করবে না বা তুমি তোমার হাসবেন্ডের সাথে করবে না।

তার কিছু দিন পরেই সেই খালাকে তার বাবা বিয়ে করে। এখন কথা তো পরিষ্কার, এটা সবাই বুঝতে পারছে শালীর সাথে দুলাভাইয়ের প্রমের কারণে তিনটি সন্তান থাকার পরেও বউকে মরে ফেলা হয়। সে যদি আত্মহত্যাও করে থাকে তবে তার জন্যও তো সেই খালা আর তাদের বাবা দায়ী ছিলো।

আমার এক বন্ধুর বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে যায় যখন, তখন ওরা তিন ভাই-বোন ছোট ছিলো। ঠিক আমার বন্ধুর সাথে ওর হাসবেন্ডেরও ডিভোর্স যখন হয়, তখনও ওর তিনটা বাচ্চা। কি অদ্ভুত মিল। কিন্তু আমরা ওর খুব কাছের বন্ধু ছিলাম বলে জানি ও সংসারটা টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট পরিমানে চেষ্টা করেছে।

ওর হাসবেন্ড ওর সাথে যে আচরণগুলো করতো তা সহ্য করে থাকতে পারার মতো আত্ম-সন্মানহীন মানুষ সে শেষ পর্যন্ত হতে পারে নাই। তার হাসবেন্ড তাকে কথায় কথায় বলতো তোমার মাও তো তোমার বাবার সংসার করতে পারে নাই। এটা তো তোমার রক্তে আছে। আমাদের সমাজের একটা মজার বিষয় হলো কারো কোন দুর্বল দিক থাকলে আমরা তাকে তা দিয়ে জব্দ করতে চাওয়া।

আমি মনে করি প্রতিদিন কুৎসিত ঝগড়া করা ছেলে-মেয়েদর সামনে, তার পরেও যে সংসারগুলো শুধু মাত্র লোকে কি বলবে? আর অন্য মানুষগুলোকে দেখানো আমরা সুখি দম্পতি। এটার চাইতে বড় আত্ম প্রতারণা আর কি হতে পারে? আমাদের ভেতরে লোক দেখানো বিষয় সব চাইতে বেশি।

আমাদের ছোট বেলায় আমাদের পাড়ার একটা ঘটনা আমার মনের ভেতরে গভীর ভাবে গেঁথে আছে, সেই ঘটনা টা বলছি। আমাদের পড়ার মধ্যে একটা পুকুর ছিলো সেই পুকুরের পাশে ছিলো আমার ছোট খালার সাথে চাকরি করতো এক খালাম্মা, তাদের বাসা। সেই বাসায় একজন ভাড়াটিয়া ছিলো তাদের তখন ছোট ছোট বাচ্চা ছিলো তাদের একটা বাচ্চা আমার খেলার সাথী ছিলো এবং এখনো বন্ধু।

আমরা ছোট বেলায় পুকুর পাড়ের পাশের মাঠে খেলতে যেতাম। আমার এখনো পরিস্কার মনে আছে আমরা বিকেলে যখন খেলতে যাচ্ছি তখন সেই খেলার সাথীর মা আর তার খালাকে একসাথে বসে গল্প করতে দেখেছি, কারণ আগের দিনে ঘরের বা বাসার দরজা বন্ধ করা হতো মনে হয় শুধু মাত্র রাতে।

পরের দিন সকালে আমাদের পাড়ায় বিশাল হইচই আর সবাই হতবুদ্ধি হয়ে গেছে, কারণ তিন সন্তান রেখে আমাদের সেই খেলার সাথীর মা আত্মহত্যা করেছে বিষ পান করে।

তখন আমরা ছোট ছিলাম ঠিকই, তার পরেও আমরা বড়দের মুখে, তাদের আলোচনায় জানতে পারি আমাদের সেই খেলার সাথীর খালার সাথে তার বাবার পরকীয়ার ফলে তার মায়ের মৃত্যু হয় বা তার মাকে খালা আর বাবা মিলে হত্যা করে।

যদিও তখন সেই ঘটনা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। তার কিছু দিন পরেই সেই খালাকে তার বাবা বিয়ে করে। এখন কথা তো পরিষ্কার, এটা সবাই বুঝতে পারছে শালীর সাথে দুলাভাইয়ের প্রমের কারণে তিনটি সন্তান থাকার পরেও বউকে মরে ফেলা হয়। সে যদি আত্মহত্যাও করে থাকে তবে তার জন্যও তো সেই খালা আর তাদের বাবা দায়ী ছিলো।

আমাদের পাড়া থেকে ওরা চলে যায়। কিন্তু সব সময়ই আশপাশে ছিলো, তার কারণও ছিলো বাচ্চাদের এলাকার স্কুল, তাদের কিছু আত্মীয় ছিলো আশপাশে।

এই হত্যার বিচার চাইতে পারতো একমাত্র বাচ্চাগুলার নানা বাড়ি থেকে, কিন্তু সচারাচর যা হয় মেয়ে তো মরেই গেছে, এখন যদি মেয়ের জামাই এর বিরুদ্ধে কেস করি তবে বাচ্চাগুলো কে দেখবে? আর সেই মামলায় আসামি হবে তাদের আরেক মেয়ে! তখন লোকে কি বলবে?

তার চাইতে এটাই সমাধান সব কিছু চেপে যাওয়া। একজন মানুষের সাথে তার পরিবারের প্রতিটা মানুষ এক কথায় বেইমানি করেছে তার কি কোন বিচার হবে? তাদের পরিবারের অনেক কে খুবই ধর্ম-কর্ম করতে দেখেছি তারা কি এত বড় অন্যয়ের বিচার না করার কারণে দোষী সাব্যস্ত হবে?

এই রকম হাজার হাজার ঘটনা আছে আমাদের সমাজে, অন্যায়কে মেনে নেওয়ার। যে বাচ্চাগুলো তার পরেও তার বাবার আর খালার সাথে এক বাড়িতে বড় হলো, তাদের মানসিক অবস্থা আমার সব সময়ই জানতে মন চায়? তারা কি তাদের খুনি বাবাকে আর তাদের খালা যে আপন বড় বোনের হাসবেন্ডের সাথে পরকীয়া করার কারণে তাদের মায়ের মৃত্যু হয়। সেই তাদের সাথে কি পরিমাণ মানসিক চাপের মধ্যে বড় হয়েছে!

এই ঘটনাগুলোকে পরিবারগুলো ধামাচাপা দেওয়ার ফলে কি হয়- আরো দশজন স্বাভাবিকভাবে নেয় এই বিষয়গুলো। পরিবার থেকে সব সময়ই কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের দোষ দেখতে পায় না। কিন্তু অন্যের সেটা আপন ভাই-বোনের বাচ্চা হলেও কারণে অকারণে তাদেরকে ছোট করে এক ধরনের আনন্দ পায়।আশা করছি, আমার খুব কাছ থেকে দেখা এই ঘটনাগুলো নিয়ে সামনে লেখবো।

তারপর এক সময় এসে দেখে তাদের সেই গর্ব করা সন্তান মানুষ হিসেবে যাদেরকে সে হেয় করতো তাদের পায়ের নখের যোগ্যও হয় নাই। আমাদের সমাজে কিন্তু প্রবাদ আছে তা হলো, ‘অতি শখের পিঠার মাঝে থাকে কাঁচা’।

লেখক : গল্পকার, লেখক ও উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...