ক্ষুধা
লেখক সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে রাহুল। ১ঃ২৫ মিনিটে ট্রেন। মনটা আজ তার খুব ফুরফুরে। ঢাকায় যাচ্ছে সে। কাল সকালে একটা ইন্টারভিউ আছে। আজ গিয়ে ব্ন্ধু রফিকের বাসায় থাকবে। সকালে ইন্টারভিউ দিয়ে রাতের গাড়িতে আবার বাড়ি ফিরে আসবে। ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে প্লাটফর্মে। রাহুলের সিট নাম্বার ঝ-২৬, জানালার পাশেই।

গাছ-পালা, বাড়ি-ঘর সব পেছনে ফেলে হুহু করে ছুটে চলেছে ট্রেন। এইবার নিয়ে দ্বিতীয়বার ট্রেনে চড়লো রাহুল। ট্রেনের জানালা দিয়ে চলন্ত প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে মনে মনে নিজের অতীত নিয়ে জাবর কাটতে লাগলো সে।

রূপপুর গ্রামে কয়েক শতাংশ জমির উপর ছোট্ট একটা ভাঙা ঘর রাহুলদের। রাহুল যখন দশম শ্রণিতে তখনই এক দুরারোগ্য ব্যধিতে রাহুলে বাবা মারা যায়। মা আর আর ছোট বোন রেশমীর দাঁয়িত্ব এসে পড়লো রাহুলের কাঁধে। মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে সংসারের ব্যয় বহন করেও নিজের আর রেশমীর পড়াশুনা চালিয়ে নিয়ে গেছে রাহুল। গ্রামের কলেজ থেকেই বিবিএ পাস করেছে সে। আল্লাহ চাইলে এবার হয়তো কষ্টের অবসান হবে।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: অবশেষে তুমি আমার

রাহুল সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠলো। দশটায় ইন্টারভিউ। বনানী এগার নাম্বার রোডে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে। ফর্মাল পোশাকে প্রস্তুত হলো। তার বন্ধু রফিক একটা টাই দিয়ে বললো বেঁধে নিতে। রাহুল টাই বাঁধতে পারে না, তাই রফিকই টাইটা বেঁধে দিলো।

বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো রাহুল। এই পোশাকে একটা অফিসার অফিসার ভাব এসেছে। নয়টায় বাসা থেকে বের হলো সে। বাসে সিট খালি নেই। প্রচণ্ড ভীড়ের মধ্যেই গাদাগাদি করে দাঁড়ালো রাহুল। বাসের ভাড়া দিয়ে মানিব্যাগটা পেছন পকেটে রাখলো।

বনানী পৌঁছে বাস থেকে নামলো রাহুল। নিজেকে কেমন হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা তার সাথে নেই। রাহুল পেছনের পকেটে হাত দিল। মানিব্যাগটা নেই। রাহুল কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না।

‘‘ফকির তো ক্ষুধার জ্বালায় সবার সামনেই তার পা ধরে ফেললো। কিন্তু রাহুল কি করবে? পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ইচ্ছে করছে ফকিরের হাতের দশ টাকাটা কেড়ে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানটা থেকে একটা পাউরুটি নিয়ে খেতে। কিন্তু তা অসম্ভব, কারণ সে মধ্যবিত্ত। সে না খেয়ে মরে গেলেও তার ক্ষুধা প্রকাশ করার অধিকার নেই।’’

ঢাকায় আসার সময় জমির চাচার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা ধার নিয়ে এসেছিল। সব টাকা মানিব্যাগেই ছিল। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল তার। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে এগার নাম্বার রোডের দিকে হাঁটতে শুরু করলো রাহুল। এর ওর কাছে জিজ্ঞাসা করে করে ঠিকানা মতো পৌঁছাল সে।

দুপুর দুটো। মন খারাপ করে বনানী লেকের পাশে বসে আছে রাহুল। চাকরিটা মনে হয় হয়ে যাবে। পরশুদিন ইমেইল করে জানিয়ে দেয়া হবে। এ মুহূর্তে এসব ভাবতে পারছে না রাহুল। ক্ষুধায় পেট জ্বলে যাচ্ছে। মাথা ঘুরছে ভনভন করে। পকেটে একটি টাকাও নেই।

হঠাৎ কোথা থেকে এক ফকির এসে দাঁড়ালো। বাজান পাঁচটা টেকা দেন, ভাত খামু। রাহুল চুপ করে সেখান থেকে উঠে যেতে লাগলো। ফকির লোকটা রাহুলে পা জড়িয়ে ধরলো, বাজান পাঁচটা টেকা দেন, ভাত খামু। আশপাশের লোকগুলো সবাই রাহুলের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন রাহুল সেই ফকিরটার প্রতি বড় অন্যায় করছে, যেন তার মতো নির্দয় মানুষ এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।

হঠাৎ করেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো রাহুল। সবাই আরো কঠোরভাবে তাকাতে শুরু করলো। হয়তো ভাবছে কোট টাই পরা আস্ত একটা বেয়াদব। রাহুল নিজের গলা থেকে টাই খুলে ফেললো। টেনে শার্টের ইন খুলে দিলো। ততক্ষণে প্রায় পনের বিশ জন লোক জমা হয়ে গেছে।

ফকির তো ক্ষুধার জ্বালায় সবার সামনেই তার পা ধরে ফেললো। কিন্তু রাহুল কি করবে? পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা, মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ইচ্ছে করছে ফকিরের হাতের দশ টাকাটা কেড়ে নিয়ে পাশের চায়ের দোকানটা থেকে একটা পাউরুটি নিয়ে খেতে। কিন্তু তা অসম্ভব, কারণ সে মধ্যবিত্ত। সে না খেয়ে মরে গেলেও তার ক্ষুধা প্রকাশ করার অধিকার নেই।

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...