গরিবের রক্ত
লেখক সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

রহিম পেশায় রাজমিস্ত্রী। ঢাকার কত কত বহুতলভবন তৈরিতে রহিম কাজ করেছে তার হিসেব নেই। পনেরো বছর বয়স থেকেই রহিম রাজমিস্ত্রীর কাজ করে। রহিম যখন শহরের অলিতে-গলিতে হাঁটাহাঁটি করে তখন মনে মনে ভাবে, এ শহর তার হাতে তৈরি। তার মত হাজারো দিনমজুরের হাতে তৈরি এ শহর।

রহিমের মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। ছোট মেয়েটাকে ঢাকায় নিয়ে এসেছে। নাম পরি। গরিবের ঘরে কখনো পরি থাকে না। থাকলে পরিও পেত্নী হয়ে যায়। তবুও দেখবেন গরিবের ঘরের ছেলে-মেয়েদের নাম থাকে অনেক দামি দামি যেমন, রাজা, রানী, বাদশা, পরি, সম্রাট ইত্যাদি।

পরি খুব বায়না করছিলো ‘আব্বা আমারে ঢাকা লইয়া যাও। আমার ইস্কুলের বইয়ে দেখছি ঢাকায় চিড়িয়াখানায় বাঘ, ভাল্লুক আছে’। বায়না পূরণ করতেই ঢাকা নিয়ে আসা। আসার পথে মেয়েটা বড় বড় দালানগুলোর দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিলো তা দেখে রহিমের মুখেও হাসি ফুটে উঠছিল।

রহিম আজকে বাবুদের মত করে সেজেছে। মাথায় চপচপে করে তেল দিয়েছে। বাম পাশে সিঁথি করে চুলগুলো সব ডান দিকে লেপে দিয়েছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি টুপ করে একফোটা তেল মাথা থেকে ঝরে পড়বে।

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : এক রাতের হিমু

চোখে টকটকে লাল চশমা। চশমাটা গুলিস্তানের এক ফেরিওয়ালার কাছ থেকে খুব শখ করে কিনেছিল। আজই প্রথমবার চোখে চশমাটা পরলো রহিম। পায়ে পাঁচবার মুচির দর্শন করে আসা জুতা। মুচি শেষবার মেরামতের কোন উপায় না পেয়ে লাল রঙের পট্টি লাগিয়ে দিয়েছে দুই জুতাতেই। রহিমের ধারণা এতে জুতার সৌন্দর্য খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ দালানডা আমরা বানাইছিলাম রে মা। এই দালানে কাম করতে গিয়া তর ছোড চাচায় ঐ দশ তালাত্থেন পইরা মরছিল। বলতে বলতে গলা ধরে এলো রহিমের। বাবা, দালানডা অনেক সুন্দর, আমারে নিয়া যাইবা ভিতরে? আমগোরে ভিতরে ঢুকপার দিবো না রে মা। বড়লোকেরা যায় ঐহানে। গরিবের রক্ত পাড়াইয়া যাওয়ার অধিকার শুধু বড়লোকেরই থাকেরে মা।

বাবা মেয়ে কাকরাইলের ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কে গেল। সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্মৃতি স্তম্ভের নিচে পরি পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর রহিম পরিকে নিয়ে গেল শহীদ জিয়া শিশু পার্কে।

মেয়ের বায়নার কাছে হাড় মেনে রহিমকেও মেয়ের সাথে হেলিকপ্টারে উঠতে হলো। সব শেষে রহিম মেয়েকে নিয়ে গেল চটপটি ফুসকার দোকানে। পরি দুই প্লেট ফুসকা খেলো। মাঝে মাঝে একটা করে রহিমের মুখেও ফুসকা তুলে দিল পরি।

মেয়েকে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো রহিম। শাহবাগের মোড় পার করে এসে একটা চৌদ্দ তলাবিশিষ্ট পাঁচতারা হোটেলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গেল রহিম। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভবনটার দিকে।রহিম অন্যদিকে ঘার ঘুরিয়ে শার্টের হাতায় চোখের জল মুছলো। বাবা-মেয়ের এই ভালোবাসার সম্পর্কটা রহিমের কাছে একবারেই নতুন। রহিমে ইচ্ছে করছে পরিকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে কপালে চুমু দিয়ে পিতার আদরের চিহ্ন একে দিতে।

পরি জিজ্ঞাসা করলো,
-আব্বা, কি হইছে?
-এ দালানডা আমরা বানাইছিলাম রে মা। এই দালানে কাম করতে গিয়া তর ছোড চাচায় ঐ দশ তালাত্থেন পইরা মরছিল। বলতে বলতে গলা ধরে এলো রহিমের।
-বাবা, দালানডা অনেক সুন্দর, আমারে নিয়া যাইবা ভিতরে?
-আমগোরে ভিতরে ঢুকপার দিবো না রে মা। বড়লোকেরা যায় ঐহানে। গরিবের রক্ত পাড়াইয়া যাওয়ার অধিকার শুধু বড়লোকেরই থাকেরে মা।
পরি বাবার কথার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারে না। শুধু হা করে বাবার উদাস মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

উচা হিলের বুট ও কোটা টাই পড়া একজন লোক পাকার উপর খটখট আওয়াজ তুলে এগিয়ে এসে হুঙ্কার ছাড়ে,
-এই যে লাট সাহেবের বাচ্চা, গেটের সামনে উটের মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ওই হারামজাদা গফুর, দারোয়ানি করছ নাকি ঘুমাস? গেটের সামনে জমিদারের বাচ্চারা দাঁড়াইায়া আছে চোখে পড়ে না?

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...