‘গ্রে প্রোডাক্ট ইম্পোর্টাররা দেশ ও কাস্টমারের ক্ষতি করছে’

উজ্জ্বল এ গমেজ

২০০৮ সালে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে এলজি মোবাইল কোম্পানিতে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলামের মোবাইল ব্যবসা। ধারাবাহিকভাবে স্প্রিন্ট, আই মোবাইল, মালাটা, কল-মি, সিসিআইটি, লেমন, জিওনিসহ কয়েকটি চায়নিজ ব্র্যান্ডের মোবাইল নিয়ে কাজ করে আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স লিমিটেড (ডিসিএল) হ্যান্ডসেট ব্র্যান্ডের মোবাইল বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে তিনি মোবাইল, আইটি, সিকিউরিটি,আইওটি, রোবটিক্সস অ্যান্ড অনলাইন বিজনেস এর ইনডিপেন্ডেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের মোবাইল মার্কেটের বর্তমান অবস্থা, নানা চ্যালেঞ্জ, হালচাল নিয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম। একান্ত আলাপে জানালেন দেশের মোবাইল মার্কেটের আদ্যোপান্ত।

দেশের মোবাইল মার্কেটের বর্তমান অবস্থাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম : ২০১৮ সালের ওয়ান, টু, থ্রি কোয়াটারের কথা যদি বলি তাহলে গ্লোবালি মোবাইল কোম্পানির হেড কোয়াটারগুলোতে জানেন যে ৩% মাইনাসে চলছে। তবে আমাদের দেশের মোবাইল মার্কেটে মাইনাসটা হয়েছে আরো বেশি। মোবাইল ইন্ডাস্ট্রিতে আমি এখন আপনারি ডটকমে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করছি। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি দেশের অনেকগুলো কোম্পানি ভিজিট করছি। শুধু মোবাইল না ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলোও। সার্বিক দিক থেকে বলতে গেলে দেশের মোবাইল মার্কেটের অবস্থাটা বেশি ভাল না। মার্কেটের গ্রোথটা ইতোমধ্যেই মাইনাসে আছে। আর নতুন বছরের গ্রোথটাও মাইনাসে থাকবে।

মার্কেটের অবস্থা কেন এমন হচ্ছে?
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম : এই সমস্যাটা তৈরি হওয়ার এক নম্বর কারণ হচ্ছে, যদি ফিজিক্যাল কারণের কথা বলি তাহলে বলা যায় মার্কেটে এখন কাস্টমার খুবই কম। এটা একটা বিষয়। এর আবার কারণ হচ্ছে, আমাদের ইউজার যারা সে ইউজার থেকে সেকেন্ডারি ইউজারকে রিটার্ন ব্যাক করবে সে রিটার্ন ব্যাকটা কিন্তু হচ্ছে না। কারণ, আগে যেমন একটা ইউজার ১০০০ টাকার ফিচার ফোন ব্যবহার করত এখন দেখা যাচ্ছে সেই লোকটাই এখন ৫০০০-৬০০০ টাকার একটা স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। এখন তার চিন্তা হচ্ছে যে আগে একটা ফিচার ফোন তিন মাস ব্যবহার করতাম। তাহলে এখন একটা স্মার্টফোন কীভাবে এক বছর ব্যবহার করা যায়। যদি আমরা হিসেব করি একটা ফিচার ফোনের লাইফটাইম ৮ মাস। কিন্তু ব্যবহারকারীরা আরো বেশি ব্যবহার করতে চান। কেননা তিনি এখানে বেশি টাকা ইনভেস্টমেন্ট করেছেন। তাহলে কীভাবে ওই টাকার সদ্ব্যবহার করা যায় সেভাবেই চিন্তা করছেন ব্যবহারকারীরা। এর উপর ভিত্তি করে কিন্তু ফোনের ইউজার কমে যাচ্ছে।

আরেকটি কারণ হচ্ছে আমাদের মোবাইল অপারেটরদের তথ্য মতে, দেশে এখন একশ চল্লিশ মিলিয়ন ইউজার রয়েছে। তাহলে হ্যান্ডসেটও ততগুলি ইউজ হচ্ছে। পাশাপাশি, আমাদের তরুণ প্রজন্ম সব সময়ই নতুন ফোন ব্যবহার করতে চান। সে যে ফোনটা ইউজ করছে এর থেকে একটু কোয়ালিটি হাই, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। এসব কারণেই আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো একটু পেছনে পড়ে যাচ্ছে। তাই এখন সবাই ফোকাস করছে যে কীভাবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কেনা যায়। কীভাবে একটা ভাল ব্র্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইউজার এক্সপিরিয়েন্স। এটা স্বীকার করতেই হবে যে, বাইরের ব্র্যান্ডগুলোর ইউজার এক্সপিরিয়েন্স দেশীয় ব্র্যান্ডের থেকে ভাল।

ইতোমধ্যেই আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি মোবাইল হ্যান্ডসেট কোম্পানি সংযোজন কারখানা চালু করেছে। এগুলো আমাদের দেশীয় মোবাইল মার্কেটে কী রকম প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন।
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম : দেশে বেশ কয়েকটি মোবাইল কোম্পানী ফিচার ও স্মার্টফোন সংযোজন করছে। আসলে তারা যা করছে মূলত শুধু অ্যাসেম্বেল করছেন। তারা কিন্তু সিকেডি করছেন না। এটার কারণে যেটা হচ্ছে যে, ইনোভেশন, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট যতক্ষণ পর্যন্ত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বাংলাদেশি কাস্টমারদেরকে ওই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লেবার যেটা সেটা কিন্তু আমরা দিতে পারবো না। যেমন- গার্মেন্টেসে আমরা দেখছি, আমাদের প্রোডাক্টস কিন্তু দেশের বাইরে রফতানি হচ্ছে। আমরা যদি রফতানির চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই ইনোভেশন দরকার। নিজের স্বকীয়তা দরকার, রিসার্চ সেন্টার দরকার। এগুলো বাংলাদেশে আদৌ সম্ভব কিনা তা বলা কঠিন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও কিন্তু এই জিনিসটা করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারছে না।

আমাদের দেশে গ্রে মার্কেটের সংখ্যা বাড়ছে কেন?
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম : গ্রে মার্কেট বাড়ার প্রধান কারণ হলো ট্যাক্স। আমাদের ট্যাক্সের পরিমাণ অন্যদেশের তুলনায় অনেক বেশি। ট্যাক্স বেশি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীদের অবৈধপথে ব্যবসা করার প্রবণতাটা একটু বেশি। কারণ, ব্যবসায় কাস্টমাররা চায় কম দাম। গ্রে প্রোডাক্টটা আনতে গিয়ে যেটা হয় সেটা হলো তারা তো ট্যাক্সটা ফাঁকি দিচ্ছে। এর ফলে তারা দাম কমে পাচ্ছে। এখন আপনি রাজধানীর প্রায় প্রতিটা মোবাইলের দোকানে গিয়ে দেখবেন যে, শাওমির প্রোডাক্ট আছে। আপনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এগুলোর মধ্যে গ্রে প্রোডাক্টই বেশি। এতে করে লিগ্যালি ইম্পোটারের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এখন এই সমস্যা ফেস করার জন্য তারা হয়তো কিছু বলছে কিনা বা তাদের মনোভাবটা কি সেটা আমরা জানি না। আমাদের মনোভাবটা হচ্ছে সরকারের পয়সা পাওয়া উচিত। একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের চাওয়া যে, ইলিগ্যাল সব কিছু বন্ধ করে লিগ্যাল উপায়ে চলুক সব কিছু। তাতে মার্কেটটা স্ট্যাবল থাকবে। আর একটা কথা যারা ইলিগ্যালি গ্রে প্রোডাক্ট ইম্পোর্ট করছে তারা নিজের জন্য সাময়িক ইনকাম করছে, কিন্তু ক্ষতি করছে দেশের ও কাস্টমারের। তবে ওই ব্র্যান্ডের মার্কেটটাকে বড় করে দিচ্ছে। ইলিগ্যালি গ্রে প্রোডাক্ট ব্যবসায়ীদের ব্যবসাটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। একটা সময়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের মতে, ওই ব্র্যান্ডটা যদি ইন্টারন্যাশনাল হয়ে থাকে তাহলে তার উচিত এটাকে যেভাবে হোক এটাকে কন্ট্রোল করা। সে হয়তো শতভাগ কন্ট্রোল করতে পারবে না। তবে চেষ্টা করলে পারবে।

মোবাইল ব্যবসার ভবিষ্যৎ কেমন?
মুহম্মদ তৌফিকুল ইসলাম : মোবাইল ইন্ডাস্ট্রি যে ইনোভেশন নিয়ে কাজ করছে সেটা খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রতিনিয়তই স্মার্টফোনে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ফিচার ও টেকনোলজি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, উন্নত ওয়ারলেজ চাজিং টেকনোলজি, ২৪ ম্যাগাপিক্সেলের সেলফি ও পেছনে ১৬টি রিয়ার ক্যামেরা, ফেস আনলকিং, আইরিশ স্ক্যানারসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আর স্মার্টফোনের সাথে যেসব রিলেটেড ডিভাইস রয়েছে এসব প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আগ্রহও দিন দিন বাড়ছে। আমার ধারণা প্রযুক্তিপ্রেমীদের প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি কদর বাড়তেই থাকবে। আগামীতে স্মার্টফোন ব্যবসা থাকবে কিন্তু সবার ফোকাস থাকবে আরও নতুন নতুন টেকনোলজি ও ইনোভেশনে। বাজারে স্মার্টফোন ব্যবসা কমবে কিন্তু স্মার্টফোনকেন্দ্রিক বিভিন্ন ডিভাইস এর ব্যবসাটা ভালো হবে।

টেকভয়েস২৪/পিবি