দিন শেষে মাও তো একজন মানুষ
ছবি : জান্নাতুন নুর দিশা

টেকভয়েস২৪ ডেস্ক :: আমরা সবসময় আমাদের মায়েদের মহত্ত্বের গল্প বলতে এবং শুনতে ভালোবাসি। মায়েদের স্যাক্রিফাইজের গল্পগুলো নিয়মিত আমাদের চোখ ভেজায়।

আমরা আমাদের মায়েদের ত্যাগের প্রতিমূর্তি হিসেবে দাঁড় করাতে ভালোবাসি। শত কষ্ট, আঘাত, বঞ্চনা সহ্য করা, সংসারে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এক বোকাসোকা সরলসোজা মহিলার অবয়ব আমাদের চোখে আমাদের মা। যিনি আজীবন নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে আসেন আমাদের জন্য, সংসারের জন্য। মায়েরা মহান, মায়েরা ত্যাগী, মায়েরা দেবী। ওকে ফাইন!

এইসব আলোচনা করে এবং শুনে চোখের জলে নদী বানিয়ে মূলত মায়ের জন্য ভালোবাসা দেখানো হয়?

আচ্ছা, এ কেমন ভালোবাসা? একজন মানুষ কেবল করেই যাবেন, করেই যাবেন, করেই যাবেন। আপনি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেই যাবেন, করেই যাবেন, করেই যাবেন এ কেমন নিয়ম?

এ যুগের অনেক ছেলেকেই বলতে শুনবেন, ‘আমাদের মায়েরা হেন ছিল, তেন ছিল, সরল ছিল, সংসারী ছিল, ত্যাগী ছিল, নিজের জন্য কিছু ভাবতেন না, সাজতেন না, বের হতেন না ইত্যাদি।’ ওকে ফাইন!

আপনার মাকে মা না ভেবে, দেবী না ভেবে একজন মানুষ ভাবুন তো পাঁচ মিনিটের জন্য। আপনিও একজন মানুষ, আপনার মাও একজন মানুষ। আপনার মায়ের জীবনটা যদি আপনাকে দেয়া হয় আপনি নিতে রাজী হবেন সানন্দে?

যে জীবনে কোনো রঙ নেই, নিজের জন্য কোনো চাওয়া নেই, প্রাপ্তি নেই, অন্দরমহল নামের চার দেয়ালে প্রতিদিন সেই একই রকম জীবনযাপন। কেবল স্যাক্রিফাইজ, স্যাক্রিফাইজ, স্যাক্রিফাইজ…!  নেবেন এমন জীবন? নিতে পারবেন?

এখন হয়তো বলবেন, ‘এই জন্যই তো মায়েরা এত সম্মানিত, এত পূজনীয়। এই জন্যই তো মায়েরা মহান।’ হোল্ড অন। মাকে দেবীর আসন থেকে নামিয়ে একজন রক্তমাংসের মানুষ ভাবতে বলেছিলাম একটু আগেই।

আপনি সন্তান তার জন্য কী করেছেন? কোন স্যাক্রিফাইজটা করেছেন? তার প্রতিদিনের আত্মত্যাগ দেখে লোকজনকে ‘আমার মা মহান’ বলে গর্বিত হওয়া ছাড়া কী করেছেন আপনি?

আপনি কখনো নিজের মাকে কর্পোরেট লেডি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন?

তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যদি কর্মক্ষেত্রে যেতেন, যদি নিজের জন্য কিছু ভাবতেন, যদি আত্মসচেতন হতেন, উচ্চশিক্ষিত হতেন, যদি আপনার বাবার ব্যাপারে যেমন পরিচয় দেন যে আমার বাবা একজন শিক্ষক/ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার/সাংবাদিক/অফিসার, মায়েদের ব্যাপারেও যদি সেভাবে পরিচয় দিতে পারতেন?

যদি আপনার মা নিজের ভালমন্দের ব্যাপারে, নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার ব্যাপারে সচেতন হতেন? যদি খাবার রেঁধে সবার না খাওয়া পর্যন্ত না খেয়ে বসে না থেকে ক্ষুধা পেলে নিজে খেয়ে নিতেন? যদি আপনার বাবার অযৌক্তিক বকাবকির সময় চুপ করে অশ্রুবিসর্জন না করে মুখ ফুটে নিজেও কিছু বলতেন?

কী? মানতে পারছেন না? অস্বস্তি হচ্ছে? মনে হচ্ছে আপনার মাকে মহত্ত্বের জায়গা থেকে টেনে নামিয়ে আনছি? মায়ের মহৎ, দেবীসুলভ প্রতিরূপের সাথে সাংঘর্ষিক মনে হচ্ছে? এমন মায়ের অবয়ব খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে?

তাহলে জেনে রাখুন, সন্তান হিসেবে আপনি ভীষণ স্বার্থপর! হ্যাঁ, ভীষণ স্বার্থপর।

মাকে দেবীত্বের আসনে বসিয়ে মহৎ সাজিয়ে তার কাছ থেকে আজীবন স্যাক্রিফাইজ আশা করেছেন আপনি, তার জীবনের চাওয়া-পাওয়া, তার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আপনি কখনো ভাবেননি।

তিনি তো একজন মানুষ,আপনার মতই রক্তমাংসে গড়া একটা মানুষ। তার কি জীবনে নিজের জন্য কিছুই পাওয়ার নেই?

‘আমার জামাইকে দেয়া মানে আমাকে দেয়া, আমার ছেলে খাওয়া মানে আমি খাওয়া, আমার মেয়ে সুখী হওয়া মানে আমি সুখী হওয়া’ মায়েদেত এসব ডায়ালগ আপনার চোখে জল আনে তাই না?

কিন্তু আপনার মার কি আসলেই কিছু চাওয়ার নেই জীবনে? নাকি আপনাদের দেয়া মহত্ত্বের বোঝার নিচে চাপা পড়েছিলো তার নিজের সব চাওয়া? আচ্ছা, আপনার কোনো চাওয়া নেই আপনার মায়ের জন্য?

সন্তান হিসেবে কী মহত্ত্ব দেখিয়েছেন আপনি? নাকি সন্তানের মহৎ হবার প্রয়োজন নেই? মায়ের জন্য কোনো চাওয়াই যদি না থাকে, নিজেকে কেমন সন্তান মনে করেন? এ কেমন ভালোবাসা আপনার?

মাকে ভালোবাসেন? সত্যিই ভীষণ ভালোবাসেন? তাহলে মাকে আপনার মতই একজন মানুষ ভাবতে শিখুন। দেবী নয়, দিন শেষে মা ও তো একজন মানুষ।

(জান্নাতুন নুর দিশা এর ফেসবুক পেজ থেকে. . .)

টেকভয়েস২৪/পিবি