ধর্ষকের জবানবন্দি
সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

আমি রফিক। মফিজপুর থানার এস আই। সারারাত খুব ধকল গেছে। থানার পাশের মহল্লার এক কিশোরী নিখোঁজ। সারারাত খোঁজাখুজির পর ভোরবেলায় রেলওয়ে স্টেশনের পেছনে পরিত্যক্ত জমিতে পাওয়া গেল। বিবস্ত্র নিথর দেহ পরে ছিলো ঘাসবনের আড়ালে। লাশ ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে কোয়াটারে ফিরে চোখটা বন্ধ করেছি, ওমনি মোবাইলটা বেজে উঠলো।

থানায় ঢুকে আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ঢুকার সময়ই দেখলাম দরজার পাশে এক যুবক মাথা নীচু করে বেঞ্চে বসে আছেন। মুখভর্তি খোচাখোচা দাড়ি। ভয়ংকর অপরাধীর ছাপ পরে আছে লোকটার উপরে। লোকটার সাথে কথা বলার মত কোন ইচ্ছাই এখন অবশিষ্ট নেই। এমুহূর্তে কড়া লিকারের এক কাপ রং চা দরকার।

লোকটা আমার সামনে বসা। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হচ্ছে। আমার হাতে কড়া লিকারের রং চা।
-স্যার মাইডারে আমি ধর্ষণ কইরা খুন করছি।
-কথার আকস্মিকতায় গরম চায়ে আমার জিভ পুরে গেল। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করলাম, কি বললেন আপনি?
-সত্যি কথাই কইছি, মাইয়াডারে আমি ধর্ষণ কইরা খুন করছি।
-এক ঝলকের জন্য লাশের চেহারা চোখে ভেসে উঠলো। মাথায় চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। একলাফে চেয়ার থেকে উঠে লোকটার শার্টের কলার ধরে টেনে নিয়ে লকাপের এক কোনে ছুড়ে মারলাম। খটাস করে লকাপের দরজাটা বন্ধ করে চেয়ারে ফিরে এলাম। গায়ের লোম সব কাটার মত দাঁড়িয়ে আছে।

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : গরিবের রক্ত

সকাল দশটা। আসামীকে জবানবন্দির জন্য নেওয়া হয়েছে। টেবিলের দুই প্রান্তে আমরা দুজন। এক গ্লাস পানি ঠেলে দিলাম লোকটার দিকে। পানির গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলতে শুরু করলো,
-আমি আনোয়ার, বয়স সাতাইশ। গতকাল রেল লাইনের পাশ দিয়া যাওনের সময় মাইয়াডারে একলা পাইয়া ইস্টিশনের পিছে নিয়া গিয়া ধর্ষণ করছি।
-মাত্র বার বছরের একটা মেয়েকে দেখেও লালসা জাগে? অতটুকু মেয়ে, তাকেও রেহাই দিলি না কুত্তার বাচ্চা?
-স্যার মাইয়াডা বড় হইলে কি কইতেন?

-আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। শরীরের সব শক্তি দিয়ে চড় বসিয়ে দিলাম বদমাইসটার গালে। চেয়ার সহ পরে গেল। কলার ধরে টেনে বসালাম।
-স্যার, যদি মারতে চান মারেন। আমার আপত্তি নাই। আর যদি আমার কথা শুনতে চান তো আমি কই আপনার ধৈর্য নিয়া শুনতে হইবো।

স্যার, কোন মানুষের জন্মই ধর্ষক হইয়া হয় না। স্যার, সব মানুষই বাবা-মার আদর-যত্নে বড় হয়। উঠতি বয়সে পোলা মাইয়ারা ভালো খারাপ অনেক বন্ধু-বান্ধবের লগে মিশতে শুরু করে। এই সময়ই যে কত পোলা মাইয়ারা নেশার জগতে ঢুইক্কা যায় তার ঠিক নাই। আমগও একটা দল আছিলো। পাঁচটা পোলা দুইডা মাইয়া। সবাই অনেক ভালো ভালো পরিবারের। টাকা পয়সার কোন অভাব আছিলো না।

আমি একগ্লাস পানি খেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চেয়ার টেনে বসলাম। আনোয়ার আবার বলতে শুরু করলো,
-আমি ইস্টিশনের পাশের পার্কে এক কোনায় তাবু বানাইয়া থাকি। গতকাল সন্ধ্যার দিকে পার্কের মইধ্যে দুইডা পোলা আর একটা মাইয়া আইলো। মাইয়াডার কাপড় চোপর মোডেই ভালা না, শইলের লগে লাইগা আছে। চামড়ার রঙের পায়জামা পরছে। দুর থাইক্কা মনে হয় গায়ে কিচ্ছু নাই। চক্ষের সামনে কাপড় চোপড় ছাড়া একটা মাইয়া মানুষ, আবার দাড়াইয়া দাড়াইয়া পোলাগ লগে বিড়ি টানতাছে। মাথাডা পুরা আউলািয়া গেল। শয়তান ভর করলো শইলের উপর। পার্ক থাইক্কা বাইর হইয়া বাচ্চা মাইয়াডারে একলা পাইলাম। তহন মাইয়া ছোড না বড় দেহার সময় আছিলো না।
-স্যার, এইডা আমার প্রথম না, আমি আগেও ধর্ষণ করছি কিন্তু খুন করি নাই আগে। এইবার করছি মাইয়াডা আমারে চিনা ফালাইছিলো তাই।

-আমি আবারো চমকে উঠলাম। গলা চেপে ধরলাম ধর্ষক আনোয়ারের। জানোয়ারটা কে এখানেই শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে।

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : এক রাতের হিমু

-স্যার, আরেকবার গায়ে হাত দিলে আমি আর কিছু কমু না। স্যার, আমিই নিজেই এইবার আমার ফাঁসি চাই, আপনারা না দিলে আমি নিজে নিজেই ফাঁস লমু স্যার। তয় মরার আগে কয়ডা কথা কইয়া যাইতে চাই স্যার।
আমি ওর গলা ছেড়ে দিলাম, আবার বসলাম চেয়ারে।

-স্যার, কোন মানুষের জন্মই ধর্ষক হইয়া হয় না। স্যার, সব মানুষই বাবা-মার আদর-যত্নে বড় হয়। উঠতি বয়সে পোলা মাইয়ারা ভালো খারাপ অনেক বন্ধু-বান্ধবের লগে মিশতে শুরু করে। এই সময়ই যে কত পোলা মাইয়ারা নেশার জগতে ঢুইক্কা যায় তার ঠিক নাই। আমগও একটা দল আছিলো। পাঁচটা পোলা দুইডা মাইয়া। সবাই অনেক ভালো ভালো পরিবারের। টাকা পয়সার কোন অভাব আছিলো না।

-এমনিতে সবাই উপরে উপরে ভদ্র হইয়া থাকলেও ভিতরে ভিতরে এমন কোন নেশা নাই যে করি নাই।সব রকম নোংরামি চলতো আমাগ মাঝে। আমার বাবায় সব জানতে পাইরা খুব মারলো, আবার আদর কইরা বুঝাইলো ও অনেক কিছু। উঠতি বয়স, ইস্কুলে গেলে দেখতাম প্রায় সব পোলারাই ক্লাসের অনেক মাইয়ারে নিয়া অনেক খারাপ কথা কয়। স্যার, আমি বাজি ধইরা কইতে পারি আপনের ইস্কুল জীবনেও আপনি এইগুলা দেখছেন, তয় আপনে ভালার দলে আছিলেন তাই আজকে আপনে পুলিশ। কলেজ জীবন তো আরো বাজে অবস্থা।

-স্যার, ভালো হওয়ার অনেক চেষ্টা করছি। চুপচাপ যাইয়া যুবক পোলাপাইনে ভীড়ে দাঁড়াইছি, গালি ছাড়া কেউ কথা কয়না স্যার। নিজের বন্ধুর লগে কথা কয় তাও একজন আরেক জনরে গালি দিয়া। আর সামনে দিয়া চিপা চাপা কাপড় পরা কোন মাইয়া গেলে একেকজনের মুখ দিয়া যেইসব কথা বাইর হয়, শুনলে কইবেন স্যার, একটা মাইয়ারে ওরা কিভাবে মুখের কাথাই ধর্ষণ করে।

-স্যার আপনেরা কন কাপড়-চোপর বিষয় না, এইডা ভুল কথা স্যার। যেই দেশের মানুষ রাস্তায় দুইডা কুত্তার মিলন দেখলেও সেইডা নিয়া মজা করে, সেইদেশের মানুষের সামনে দিয়া শরীর দেহাইন্না পোশাক পইরা গেলে মানুষের মুখ দিয়া এমনিতেই লালা ঝরবো।

-একসময় সিনেমার নাইকারা শাড়ি পরতো এহন নাইকাগ গায়ে কাপড় খুঁইজা পাওয়া যায় না। কেন জানেন স্যার? পবালিক ডিমান্ড, মানুষ যা দেখতে চায় তা না দেখাইয়া উপায় কি? আর আজকাল সিনেমার গানগুলা তো পরিবারের লগে বইয়া দেখতেই পারবেন না। এইগুলা দেইখা মাথায় খারাপ চিন্তা আইবোই স্যার আমি বাজি ধইরা কইতে পারি।

-আরেক দিন চার-পাঁচটা মাইয়া ঢুকলো পার্কে। আমারে খেয়াল করে নাই। মাইয়া মানুষও একসাথে খারাপ গল্প করে একজন আরেকজনরে নোংরা গালি দিয়া কথা কয় ঐদিন শুনলাম। অনেক বয়স্ক মানুষরেও মাইয়া দেইখা বাজে কথা কইতে শুনছি। স্যার, বেশি না সাধারণ মানুষের পোশাক পইরা সাধারণ মানুষের ভীড়ে কান খোলা রাইখা এক সপ্তাহ থাকেন, দেখবেন আমার কথা কয়ডা সত্যি কয়ডা মিছা।

-বিশ বছর বয়সে ঘর বাড়ি ছাইড়া চইলা আইছি। আমি চাই নাই আমার লাইগা আমার বাপের সন্মান নষ্ট হোক। কিন্তু নিজেরে পাল্টাইতে পারি নাই স্যার। স্যার, সভ্য সমাজের মানুষের মইধ্যেই সভ্যতা হারাইয়া যাইতাছে তো আমরা অসভ্যরা সভ্য হমু কেমনে? স্যার, আমি আনোয়ার মইরা গেলে যদি বাংলাদেশ ধর্ষণমুক্ত হইয়া যায় তয় আমি হাসতে হাসতে মরতে রাজি।

আজ রাত বারটা দশ মিনিটে আনোয়ারের ফাঁসি হবে। তিনটি ধর্ষণ ও একটি হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে আনোয়ারের ফাঁসির আদেশ জারি করেছে আদালত। মৃত্যুর আগে তার শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হলে আনোয়ার আমার সাথে বসে চা খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল।

আনোয়ার আমার কক্ষে আমার সামনের চেয়ারটা আমার মুখোমুখি বসে আছে। তার হাতে এক কাপ চা। টেবিলের উপর আজকের পত্রিকা। প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে লেখা “ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন শেষে বাসায় ফিরতে গিয়ে ধর্ষিত হল এক কলেজ ছাত্রী।” হেডলাইনটায় চোখ বুলিয়ে আনোয়ার আমার দিকে তাকালো। তার ঠোটের ফাকে রক্ত হিম করা হাসি।

(সমাপ্ত)

লেখকের কথা: গল্পটি অনেক সময় নিয়ে অনেক ভেবে-চিন্তে লেখা হয়েছে। অনেক রিসার্চ এবং কিছু বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গল্পটি লেখা। লেখায় প্রকাশিত ভাবনায় কারো দ্বিমত থাকতেই পারে। তবে যদি প্রকাশিত ভাবনা বাস্তব প্রেক্ষাপট সম্পর্কিত মনে হয়, তাহলে সকলের নিকট লেখকের অনুরোধ, আসুন আমরা সুস্থ সুন্দর চিন্তা, রুচিশীল পোশাক পরিচ্ছদ ও সুস্থ মানসিকতায় সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি। আমরা হয়তো সাধু সন্ন্যাসী হতে পারবো না। চেষ্টা করলে প্রত্যেকেই একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস। ধন্যবাদ।

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...