ল্যাপটপ কেনার সময় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার
ছবি: সংগৃহীত

টেকভয়েস২৪ ডেস্ক :: ২০ বছর আগে ল্যাপটপ বিলাসিতার পণ্য হলেও আধুনিক জীবনে এটি অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ডিভাইসটি দৈন্দদিন ব্যবহার্য জিনিসে পরিণত হয়েছে।

তবে কাজের ধরন অনুযায়ী বাজারে বিভিন্ন মান ও কনফিগারেশনের ল্যাপটপ রয়েছে। বহন করার সুবিধা, নানা ধরনের ফিচার, উন্নত প্রযুক্তি ইত্যাদি কারণে ল্যাপটপ এখন অনেক জনপ্রিয়।

গত ২০ বছরে ল্যাপটপের নকশা ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বাজারে এখন বিভিন্ন ধরণের ল্যাপটপ আছে যেগুলো একটি আরেকটি থেকে দামে এবং কনফিগারেশনে সম্পূর্ণ আলাদা।

এসব হরেকরকম কোম্পানির ল্যাপটপের মধ্যে প্রয়োজনীয় এবং সঠিক ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ বেছে নেওয়াটা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ল্যাপটপ কেনার সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখলে আপনার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে।

সাধ্যের মধ্যে পছন্দের ব্র্যান্ড ও সঠিক কনফিগারেশনের ল্যাপটপ কেনার সময় যে বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার সেগুলো এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-

পছন্দের ব্র্যান্ড
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ রয়েছে। যেমন ডেল, এইচপি, এসার, লেনোভো ইত্যাদি। আপনি যদি ভালো ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ কিনতে চান তাহলে কিনতে পারেন এসব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপগুলো। ল্যাপটপ জগতে এই ব্র্যান্ডগুলো অত্যন্ত ভালো।

সাইজ ও ওজন
আপনি কি ধরনের কাজের জন্য ল্যাপটপটি কিনছেন সেটার উপর ভিত্তি করে আপনার ল্যাপটপের সাইজ ঠিক করতে হবে। আপনি যদি সহজে বহন করার কথা ভাবেন, তাহলে আপনার জন্য নোটবুক কেনাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। নোটবুক কেনার সময় আপনাকে কিছু বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখতে হেবে। যেমন, নোটবুকটির ওজন, এটি কতটা হালকা বা সরু ইত্যাদি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আবার নোটবুকের মধ্যে অনেক নোটবুক রয়েছে যেগুলো আল্ট্রাবুক নামে পরিচিত। এগুলো বহনের জন্য সর্বাপেক্ষা উত্তম।

ল্যাপটপের স্ক্রিনের সাইজের উপর ল্যাপটপটির ওজন নির্ভর করে। ১১ থেকে ১২ ইঞ্চি ল্যাপটপ হলো সবচেয়ে হালকা বা সরু। এর ওজন ১.১-১.৫ কেজি। ১৩ থেকে ১৪ ইঞ্চি ল্যাপটপ বহনযোগ্যতা এবং ব্যবহারযোগ্যতার জন্য আদর্শ চয়েজ। এর ওজন ১.৮ কেজির নিচে হয়ে থাকে।

আপনি যদি ল্যাপটপ মূলত বাসায় ব্যবহার করতে চান বা মাঝে মাঝে বাইরে নিয়ে যাতে চান, তাহলে আপনার জন্য ১৫ ইঞ্চি ডিসপ্লে বিশিষ্ট ল্যাপটপ ভালো হবে।

এই ধরনের স্ক্রীন সাইজের ল্যাপটপগুলোর ওজন সাধারণত ২.৫ কেজি থেকে ৩ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আপনি যদি আরো বড় ডিসপ্লে বিশিষ্ট ল্যাপটপ চান তাহলে ১৭ থেকে ১৮ ইঞ্চির ল্যাপটপ নিতে পারেন।

টাচস্ক্রিন
আপনি যদি টাচ বা স্পর্শ করে পণ্য চালাতে পছন্দ করেন, তবে টাচস্ক্রিন ল্যাপটপ আপনার জন্য ভালো হবে। যেমন, উইন্ডোজ ৮ ইন্টারফেসের টাইল ও জেশ্চার আপনার টাচস্ক্রিন অভিজ্ঞতাকে উন্নত করবে এবং তা সহজে ব্যবহার করতে পারবেন।

উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমনির্ভর ল্যাপটপগুলোতে ওয়েব পেজ ব্যবহার করা সহজ। এ ছাড়াও ছবি ও ডকুমেন্টস দেখতেও সুবিধা হয়। টাচস্ক্রিন ল্যাপটপ আপনি কিবোর্ডযুক্ত ল্যাপটপ হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন।

বাজারে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে টাচস্ক্রিন সুবিধার ল্যাপটপ পাবেন। সাধারণত সিনেমা দেখা, গান শোনা, ইন্টারনেট ব্যবহার করাসহ ছোটখাটো কাজের জন্য কম দামের ল্যাপটপ কেনাই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে ১৫ ইঞ্চি পর্দার মনিটরসহ ল্যাপটপ কিনতে পারেন।

স্ক্রিনের মান
যেহেতু ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে আপনাকে সবসময় তাকিয়ে থাকতে হবে, তাই এমন স্ক্রিনের ল্যাপটপ কেনা উচিত যাতে স্ক্রিনটি আপনার সাথে খাপ খাইয়ে যায়। স্ক্রিনের আরো একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এর রেজুলেশন কত তা দেখে ল্যাপটপ কেনা।

এক্ষেত্রে ১৯২০x১০৮০ পিক্সেল এর স্ক্রিন সকল কাজের জন্য আদর্শ বিবেচনা করা হয়ে থাকে। কেনার সময় অবশ্যই একবার ল্যাপটপটি চালিয়ে দেখে নেওয়া উচিত। স্ক্রিন যদি আলো প্রতিফলন না করে তবে সেটা যেকোনো স্থানে চালানোর জন্য ভাল হবে।

অপারেটিং সিস্টেম
অনেকেই অল্প কিছু অর্থ সাশ্রয়ের জন্য প্রি-লোডেড অপারেটিং সিস্টেমনির্ভর ল্যাপটপ কেনেন না। কিন্তু নিজে থেকে ওএস এবং অন্যান্য সফটওয়্যার ইনস্টল করা কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। ল্যাপটপ কেনার সময় আপনি যে অপারেটিং সিস্টেমে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন সেটি ইনস্টল করুন।

র‌্যাম
ল্যাপটপ কেনার সময় র‌্যামের দিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত। যদি আপনি ল্যাপটপে স্মুথ পারফরম্যান্স পেতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই ৪ জিবি অথবা তার থেকে বেশি র‌্যামের ল্যাপটপ কিনতে হবে।

আর যদি আপনি ল্যাপটপে গেমিং বা ভিডিও এডিটং এর মতো কাজগুলো করার চিন্তা করেন তাহলে আপনার ৮ জিবি বা ১৬ জিবি র‌্যামের প্রয়োজন পরবে। র‌্যামের ক্ষেত্রে ডিডিআর (Double Data Rate) এবং বাস স্পিড এর দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সিপিইউ এবং গ্রাফিক্সে
বাজারে এখন ইন্টেলের কোর আই সিরিজের সিপিইউ/প্রসেসরগুলো বেশি চলছে কারণ এগুলো একই সময়ে বিভিন্ন কাজ একই সাথে করতে পারে। সাধারণ হিসেবে কোর আই ৭ সিপিউ সম্বলিত ল্যাপটপগুলো কেনা ভালো। কারণ এটি সচরাচর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ ভাল সেবা প্রদান করে থাকে। বাজেট মাঝামাঝি হলে কোর আই ৫ বা কোর আই ৩ প্রসেসরের ল্যাপটপও নিতে পারেন।

আর গ্রাফিক্সের ক্ষেত্রে, আপনি যদি সচরাচর ভিডিও এডিটিং না করেন, থ্রিডি গ্রাফিক্সের কাজ না করেন, ও ভারী গেম না খেলেন তাহলে আলাদা গ্রাফিক্স কার্ড যুক্ত ল্যাপটপ আপনার না হলেও চলবে। আর আপনি যদি গ্রাফিক্সের কাজ করেন ও হাই-এন্ড গেমস খেলেন, তাহলে গ্রাফিক্স চিপ দরকার হবে।

এক্ষেত্রে মোটামুটি বাজেটের মধ্যে হলে এনভিডিয়া জিটিএক্স ১০৫০ থেকে শুরু করে ১০৮০ (উচ্চমূল্যের) বা আরও আধুনিক কোনো গ্রাফিক্স কার্ড যুক্ত ল্যাপটপ নিতে পারেন।

এজন্য আসুসের গেমিং ল্যাপটপ আরওজি স্ট্রিক্স স্কার এডিশন দেখতে পারেন। আপনার বাজেট যদি বেশি থাকে, তাহলে আসুস আরওজি জেফ্রাস হতে পারে আপনার সেরা পছন্দের গেমিং বা হাই-কনফিগ ল্যাপটপ।

ব্যাটারি
আপনি যদি বড় সাইজের কোন ল্যাপটপ শুধুমাত্র বাড়িতে ব্যবহারের জন্য কিনতে চান তাহলে আপনাকে ব্যাটারি নিয়ে এতো ভাবতে হবে না। কারণ বড় সাইজের ল্যাপটপগুলোতে ব্যাটারিও বড় থাকে।

কিন্তু আপনি যদি বাড়ির বাইরে ব্যবহারের জন্য কোন ল্যাপটপ কিনতে চান তাহলে চেষ্টা করবেন এমন ল্যাপটপ কিনতে যেটাই ৭ থেকে ৮ ঘন্টার মতো ব্যাকআপ পাওয়া যাবে। ল্যাপটপ কেনার সময় এর ব্যাটারিতে থাকা রেটিং দেখতে ভুলবেন না।

চেষ্টা করবেন ৪৪Wh থেকে ৫০Wh এর মধ্যে থাকা ব্যাটারি সম্বলিত ল্যাপটপগুলো নিতে। তাহলেই আপনি বেস্ট পারফরমেনস পাবেন। মনে রাখবেন ল্যাপটপের ব্যাটারি যত বড় হবে সেটা আপনার জন্য ততো ভালো।

কিবোর্ড
ক্রেতা যে ধরণের কি বোর্ডের সাথে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তাকে অবশ্যই সে কি বোর্ড সম্বলিত ল্যাপটপটি কিনতে হবে। কেনার সময় অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত যে কিবোর্ডটিতে ব্যাকলিট আছে কিনা।

ব্যাকলিট থাকলে অন্ধকারেও ল্যাপটপের বোতামগুলো দেখা যায়। মাঝারি দামের ল্যাপটপের কিবোর্ডেও আজকাল লাইট থাকে।

হার্ডড্রাইভ
ল্যাপটপের হার্ডড্রাইভ বেশি দেখে কেনা উচিত যেন পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় ফাইল সংরক্ষণের জন্য স্পেসের অভাবে ভুগতে না হয়। চেষ্টা করবেন ২ টেরাবাইটের হার্ডড্রাইভ নিতে। যদি তা নিতে না পারেন তাহলে কমপক্ষে ১ টেরাবাইটের হার্ডড্রাইভ নিবেন।

প্রচলিত হার্ডডিস্ক সময়ের সাথে স্লো হয়ে যায়। আপনি যদি বাজেট একটু বৃদ্ধি করতে পারেন, তাহলে হার্ডডিস্কের বদলে এসএসডি স্টোরেজ নিতে পারেন।

২৫০জিবি এসএসডি স্টোরেজের দাম প্রায় ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার মতো, যেখানে ১ টিবি হার্ডডিস্ক পড়বে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মতো।

বাজারে ৫২০০ আরপিএম এবং ৭২০০ আরপিএম (Revolution per minute) স্পিডের হার্ডডিস্ক পাওয়া যায়। ল্যাপটপের ভালো স্পীডের জন্য ৭২০০ আরপিএম অপরিহার্য। তবে যারা নরমাল কাজের জন্য ল্যাপটপ নিতে চান তাদের ৫২০০ আরপিএমের হার্ডডিস্ক হলেও চলবে।

ওয়্যারলেস কানেকশন এবং ব্লুটুথ
ওয়াই ফাই অ্যাডাপ্টরের ক্ষমতা দেখে ল্যাপটপ কিনতে হবে যাতে নির্বিঘ্নে ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক চালনো যায়। ডুয়াল ব্যান্ডের যেসকল অ্যাডাপ্টর পাওয়া যায় সেগুলো ভাল মানের হয়ে থাকে। ব্লুটুথের ক্ষেত্রে এখন বাজারে ব্লুটুথ ৪.o নির্ভরযোগ্য।

ওয়্যারলেস কানেকশন
ল্যাপটপ কেনার সময় ল্যাপটপটি কি ধরনের ওয়্যারলেস কানেকশন সাপোর্ট করে তা দেখে নিতে হবে। ল্যাপটপে ওয়াই ফাই অ্যাডাপ্টর আছে কিনা চেক করে নিবেন। ব্লুটুথের ক্ষেত্রে ব্লুটুথ ৩.o এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। তাই ব্লুটুথ ৪.o আছে কিনা তাও দেখে নিতে পারেন।

পোর্ট
ইউ এসবি ৩ পোর্ট এর মাধ্যমে ইউএসবি ২ এর তুলনায় দ্রুত গতিতে ডাটা ট্রান্সফার করা যায়। এজন্য ল্যাপটপের পোর্টগুলো ইউ এসবি ৩ কিনা তা দেখে নেওয়া উচিত। অবশ্য বর্তমানে অধিকাংশ ল্যাপটপেই ইউএসবি ২ এবং ইউএসবি ৩ পোর্ট থাকে।

ইউএসবি ৩ ইউএসবি ২ এর তুলনায় ১০ গুণ বেশি তাড়াতাড়ি ডেটা ট্রান্সফার করতে সক্ষম। ফলে আপনার সময়ও অনেক কম লাগবে। আর ল্যাপটপে ইউএসবি ৩.১ পোর্ট থাকলে তো আরো ভালো। ল্যাপটপে অন্যান্য প্রয়োজনীয় পোর্ট আছে কিনা তাও ভালোভাবে চেক করে নিবেন।

বাজারে বর্তমানে ১০ হাজার থেকে শুরু করে ৬ লাখ টাকার ল্যাপটপও রয়েছে। আপনার কেমন ল্যাপটপ চাই তা আপনার উপর নির্ভর করে। ল্যাপটপ কেনার সময় অবশ্যই উপরের উল্লিখিত বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন।

তাহলেই আপনি আপনার জন্য সঠিক ল্যাপটপটি কিনতে পারবেন। আপনার বাজেটে যে ল্যাপটপে সবচেয়ে ভালো ফিচার রয়েছে সেটি নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এটাই হবে আপনার জন্য বেস্ট। সূত্র: ইন্টারনেট

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...