শূন্য থেকে সেরা হবেন যেভাবে?
রাজিব আহমেদ (ছবি: সংগৃহীত)

টেকভয়েস২৪ ডেস্ক :: আমরা সেরা হতে চাই, অন্তত স্বপ্ন দেখি যে, অনেক ভাল কিছু করবো এবং বড় হবো। কেউ ডাক্তার, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার, খেলোয়াড়, সিনেমার নায়ক হতে চায় এবং সেরা হতে চায়। সবাই ভাল কিছু করতে চায় জীবনে।

বাস্তবতা হলো খুব কম লোক ভাল কিছু করতে পারে আমাদের সমাজে। তাই হতাশায় কাটে আমাদের অনেকের জীবন। সবচেয়ে খারাপ দিক হলোল অল্প বয়সে অনেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে তাদের দিয়ে ভাল কিছু হবে না। মূলত তাদের জন্যই আমার এই লেখাটি।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : ‘জীবনে খারাপ সময়ে শান্তভাবে চলার চেষ্টা করতে হবে’

গত এক বছরে অনেক তরুণ-তরুণীর সঙ্গে ফেসবুকে, মোবাইল ফোনে, স্কাইপে এবং সামনা-সামনি আমার কথা হয়েছে। তাদের থেকে যে ধরনের হতাশাজনক কথা শুনেছি তার মধ্যে কিছু হলোল এমন-

১। আমি কোনো পাবলিক (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং ঢাকা মেডিকেল) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় টিকিনি, তাই আমার জীবনে আর কিছু হবে না।

২। আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তাই আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

৩। আর্টস নিয়ে পড়ছি, তাই জীবন এখানেই শেষ।

৪। আমি অনেক চেষ্টা করেও কোন চাকরি পাইনি গত ১ বছরে, তাই সারা জীবন বেকার থাকতে হবে।

৫। ফ্রিল্যান্সিং করার চেষ্টা করছি এবং প্রতিদিন বিড করি কিন্তু একটাও প্রোজেক্ট পাইনি।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে যা বললেন রাজিব আহমেদ

এসব কারণে হতাশা আসা স্বাভাবিক এবং অযৌক্তিকও নয়। কিন্তু যা মনে রাখা দরকার তাহলো, জীবনে হাল ছেড়ে দিলে কোনো লাভ হবে না। বরং খারাপ অবস্থার মধ্যেও চেষ্টা করে যেতে হবে। আর চেষ্টা না করলে নিশ্চয়ই অবস্থার উন্নতি হবে না।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : পড়ার অভ্যাস নিয়ে যা বললেন রাজীব আহমেদ

আসলে খারাপ অবস্থায় নিজের মনকে শান্ত, শক্ত ও স্বাভাবিক করতে পারাটাই যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যারা এটা করতে পারে তাদের জন্য পরের অংশটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তার জন্য আজ থেকেই চেষ্টা করা শুরু করে দিন।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : যা ভাল লাগে সেদিকে লেগে থাকুন

ঠিক আছে, ধরা যাক আমার লেখার এই অংশটুকু পড়ে আপনি পটে গেছেন এবং মনকে শান্ত, শক্ত ও স্বাভাবিক করতে পেরেছেন। এরপর কি করতে হবে? এরপর যা করতে হবে তাহল কি করতে চান, কি লক্ষ্য বা কি স্বপ্ন তা স্থির করা।

তবে আপনার অনেক টাকা হবে সে স্বপ্ন দেখবেন না। টাকা পেতে হলে আপনাকে কিছু একটা করতে হবে এবং সেদিকে দক্ষ হতে হবে। তাই কোন কাজে দক্ষ হলে এবং পরিশ্রম করতে পারলে টাকা এমনিতেই আসে। ঢাকাতে অনেক চা বিক্রেতা এবং চটপটি বিক্রেতা মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করছেন।

আসলে খারাপ অবস্থায় নিজের মনকে শান্ত, শক্ত ও স্বাভাবিক করতে পারাটাই যুদ্ধ জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যারা এটা করতে পারে তাদের জন্য পরের অংশটা অনেক সহজ হয়ে যায়। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে তার জন্য আজ থেকেই চেষ্টা করা শুরু করে দিন।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : ১০০ দিনের রিডিং গাইডলাইনের পেছনের কথা

আপনি হয়তো স্থির করতে পেরেছেন কি করতে চান। এর পরের ধাপ হলো যা করতে চান সেদিকে শেখার চেষ্টা করেন। ইন্টারনেটের যুগে প্রায় সব বিষয়ের উপর ওয়েবসাইট আছে এবং অনেক কিছু শেখা সম্ভব প্রায় বিনামূল্যে। এজন্য অবশ্য একটু ইংরেজি জানা দরকার আগে এবং তাও শেখার জন্য অনেক কিছু আছে।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : ‘যতদিন বেঁচে আছি ততদিন গাধা কাটে চলতে চাই’

পড়ার অভ্যাস থাকা খুব জরুরী। বাংলাদেশে বেশীরভাগ মানুষ মনে করে যে মাস্টার্স পাস করার পর আর নতুন করে পড়ার দরকার নেই। অথচ আমাদের মনে রাখা উচিত যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পড়ি পরিক্ষা পাসের জন্য। আর এরপর আমরা পড়ি পেশাগত জীবনে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যা আমাদের বাড়তি টাকা এনে দিতে পারে।

পড়ার পাশাপাশি আরেকটি জিনিস দরকার তাহলো প্রতিদিন সময় দিয়ে অনুশীলন বা প্র্যাকটিস করা। আপনি যে দিকে দক্ষ হতে চান, সেরা হতে চান সেদিকে আপনাকে প্রতিদিন সময় দিতে হবে প্র্যাকটিস করার জন্য।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : একজন উদ্যোক্তার জীবন বদলে দেবে যে কথাগুলো. . .

হতাশ না হয়ে ৮-১০ ঘণ্টা করে সময় দেবার চেষ্টা করুন এবং দেখবেন ৬ মাসে অন্যরকম দক্ষতা এসে গেছে আপনার মধ্যে। যে কোনো দিকেই আপনি ভাল এক ধরনের উন্নতি দেখতে পাবেন ৬ মাসের মধ্যে। আর ১ বছর নিয়মিত লেগে থাকলে অনেক উন্নতি করবেন।

তবে এজন্য আপনাকে অনেক কিছু বাদ দিতে হবে, আত্মত্যাগ করতে হবে। বিনোদন এর পরিমাণ কমাতে হবে। মন দিয়ে ৮-১০ ঘণ্টা প্রতিদিন এবং দিনের পর দিন লেগে থাকা কঠিন এটি আমি মানি। তবে এর কোনো বিকল্প নেই।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : রাজীব আহমেদের ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু কথা

অবশ্য আজ থেকেই আপনি ৮ ঘণ্টা মন দিয়ে কিছু করতে পারবেন তা নয়। বরং চেষ্টা করুন ১ ঘণ্টা সব ভুলে গিয়ে একদিকে মন দিয়ে কাজ করার, অনুশীলন করার। ১ ঘণ্টা থেকে একটু একটু করে সময় বাড়ান এবং দেখবেন ১ মাসের মধ্যে ৩-৪ ঘণ্টা আমি মন দিয়ে কিছু করতে পারছেন একাগ্রচিত্তে। আর এভাবে প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা কাজ করার অভ্যাস করতে হয়তো ৩ মাস লাগবে।

বাংলাদেশে আমরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার, সমাজ, বন্ধু, আত্মীয়, সহপাঠী, প্রতিবেশি থেকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য, বিদ্রুপ, হিংসা- এসবের শিকার হই অনেক বেশি। সেই তুলনায় প্রশংসা, উৎসাহ ও সহযোগিতা তেমন পাই না।

তাই যখন সব কিছু ফেলে আপনি একদিকে চেষ্টা করে যাবেন তখন নানা ধরনের সমস্যায় পরবেন চার পাশের মানুষের কারণে। অনেকে আপনাকে পাগল মনে করবে, অনেকে বাঁধা দেবার চেষ্টা করবেন, অনেকে আপনাকে নিয়ে ফালতু কথা বলবে। এসবকে পাত্তা দেবেন না। বরং একটু একটু করে এগিয়ে যান।

>>এই ধরনের আরো লেখা পড়ুন : বোকামি করেও আমার মহা লাভ

এক বছর পর দেখবেন অনেকেই আপনার প্রশংসা করছে। অনেকে আপনাকে সমীহ করে চলছে। আসলে লড়াইয়ের ৯০% শতাংশ আপনার নিজের সঙ্গে। আপনি যদি এ দিকে জয়ী হতে পারেন, তাহলে বাকি ১০% কোনো ব্যাপারই হবে না।

১ বছর চেষ্টা করলেই কি আমি শূন্য থেকে সেরা হয়ে যাবো? না মনে হয়। তবে সেরা হবার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে চলে আসবেন। আমার নিজের একটা উদাহরণ দেই।

ধরা যাক এই আজ ২০ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে আমি এই পোস্ট লিখলাম। এরপর আমিসহ আমরা কয়েকজন ফেসবুকে শেয়ার করলাম এবং লেখাটি আগামী কয়েকদিনে ১০০০ বার এর মত পড়া হলো।

এখন হয়তো এতেই আমি ভীষণ আনন্দিত হবো, কারণ একটি লেখা হাজার বার পড়া হলে তা নিজের কাছে এক ধরনের সন্তুষ্টি নিয়ে আসবে। কিন্তু চেষ্টা করে গেলে হয়তো এক বছর পর এই লেখাটি ১০,০০০ বার পড়া হতে পারে। অর্থাৎ সেরা থেকে আরও সেরা হবার রাস্তা সব সময় ফাঁকা আছে।

তাহলে এতক্ষণ যা বললাম তার একটা সারাংশ টানি-

১। আজকেই সিদ্ধান্ত নিন এবং নিজের মনে বারবার বলুন যে অবস্থা যত খারাপ থাকুক না কেন আপনি চেষ্টা করে যাবেন।

২। কোন দিকে দক্ষ হবার চেষ্টা করবেন তা স্থির করুন। লাগলে একটু সময় নিয়ে পরিকল্পনা করুন।

৩। পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং যেদিকে দক্ষ হতে চান সেদিকে যতটা সম্ভব পড়ার ও জানার চেষ্টা করুন।

৪। প্রতিদিন মাত্র ১ ঘণ্টা সব বাদ দিয়ে মন দিয়ে অনুশীলন করুন এবং ৩ মাসে হয়তো ১০ ঘণ্টা তা করতে পারবেন।

৫। অন্যদের ফালতু কথাকে পাত্তা দেবেন না।

৬। এক বছর লেগে থাকুন এবং দেখবেন অনেক উন্নতি হয়েছে।

তাহলে আজ থেকেই চেষ্টা শুরু করে দিন।

(রাজিব আহমেদ এর ফেসবুক পেজ থেকে. . .)

লেখক : ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর প্রতিষ্ঠাতা-সভাপতি এবং ‘সার্চ ইংলিশ’ ও ‘ডিজিটাল স্কিলস ফর বাংলাদেশ’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...