শেষ ইচ্ছা
ছবি: প্রতীকী (সংগৃহীত)

হিমেল রোজারিও

সকাল সাড়ে সাতটা। অফিসের অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ঢাকার বাইরে যেতে হবে। বাসা থেকে বের হবার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। এতো সকালে তো কারো ফোন আসার কথা নয়।

প্রথমে ভাবলাম অফিস থেকে নায়তো! কিন্তু মোবাইলটা পকেট থেকে বের করার পরে দেখলাম একটি অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি মেয়েলি কন্ঠ বলে উঠল,

– দাদা কেমন আছিস?

– আমি বললাম ভালো। প্রথমে চিনতে পারিনি। কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম মৃত্তিকার কাজিন সেঁজুতি।

-দাদা, দিদির কোনো খরব আছে তোর কাছে? দিদির ফোন বন্ধ পাচ্ছি।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: চৈত্রের শেষে

– আমিও তো গত দুই মাসধরে ফোন বন্ধ পাচ্ছি। অসুস্থ থেকে সুস্থ হবার পরে এক সপ্তাহ আমার সাথে কথা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে মৃত্তিকার ফোন বন্ধ পাচ্ছি। এর কোনো কারণ আমার জানা নেই।

-মৃত্তিকা দিদি অসুস্থ হওয়ার পরে যে রিপোর্ট কেমন ছিল তুই কি জানিস?

-না।

মা বাইরে যাওয়া মাত্রই কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই মৃত্তিকা হঠাৎ করে  আমাকে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদছিল। আমি নির্বাক হয়ে ওকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরেছিলাম। অনেকক্ষণ কান্নার পর ও শান্ত হলো।

-এই কথা শুনে আমার পা থেমে গেল। ভাবছি আজ অফিসে আজ যাবো কিনা। অপর প্রান্ত থেকে সেঁজুতি বলল,-দিদিতো অসুস্থ হবার পরে বাড়ি থেকে আবার এসেছিল রিপোর্ট নিতে। তবে একটি রিপোর্ট দিদি ভুল করে রেখে যায়। আমি পরে আবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারলাম মৃত্তিকা দিদির খাদ্য নালীতে ইনফেকশন হয়েছে।

– আমি আংকেল এবং আন্টিকে ফোন করে দেখি উনারা কিছু জানেন কিনা?

-ঠিক আছে একটু ফোন করে দেখতো কি বলে! এই কথা বলে আমি ফোন কেটে দিলাম।

রাতে বাসায় ফিরে রাতের সব কাজ সেরে আমি সেঁজুতিকে ফোন দিলাম। ফোনটা রিসিভ করছে না। আবার কিছুক্ষণ পরে ফোন দিলাম। লাইন ব্যস্ত। এক ঘন্টা পরে আবার ফোন দিলাম ফোন ব্যস্ত। পরে সেঁজুতিই ফোন ব্যাক করে বলল,

-দাদা আমি আংকেল-আন্টি দু’জনকেই ফোন করেছিলাম উনারা কেউ দিদির খাদ্য নালীতে ইনফেকশনের কথা জানে না। আর দিদি এখন আর বাংলাদেশে নেই। কারো সাথে দিদি এখন আর যোগাযোগ করে না।

-আমি সেঁজুতিকে বললাম আচ্ছা ঠিক আছে। যখন অভিমান ভেঙ্গে যাবে তখন ঠিকই বাড়িতে যোগাযোগ করবে। আমার সাথে করুক বা না করুক। এখন ঘুমিয়ে থাক চিন্তা করিস না।

‘‘আমার শেষ ইচ্ছা আমি পূর্ণ করলাম আজ। জানি না তুমি তোমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারবে কিনা। আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোনো কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এরই মধ্যে মৃত্তিকার মা ক্যাবিনে চলে আসে।’’

শহরে জীবন-যাপন করেতে করতে জীবন হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক। সারা দিনে বিশ্রামের কোন সুযোগ নেই। অফিস, অ্যাসাইনম্যন্ট নিয়ে ব্যস্ত। ভালোবাসার মানুষটি দূরে চলে গেছে সেদিকে কোন খেয়ালই নেই। সে আজ মৃত্যুপথ যাত্রী। তবুও মনটা একটুও কাঁদে না।-ধীরে ধীরে শরীর ও মনের জোর কমে যাচ্ছে। বিছানায় শরীরটাকে ছেড়ে দিলাম।

পরিবার-পরিজনকে ভুলে আজ এককিত্ব এবং নিরবতাকেই আজ কেনো যেন অনেক বেশি ভালো লাগে। হঠাৎ মৃত্তিকা আমার জীবনে এসে আমাকে আর কিছু না হলেও মানুষকে একটু ভালোবাসতে শিখিয়ে গেছে।

এই ভালোবাসার মায়াই আজ কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। অনেক মান-অভিমান, ঝগড়ার মধ্যদিয়েই পথ চলা ছিল কিছু দিনের। কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা ও বাস্তবতার কারণেই মৃত্তিকার আমার সাথে এই অভিমান করে দূরে চলে যাওয়া।

তিন মাস পর। রাত তখন ১২টা ৩৮ মিনিট। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। কে আবার এতো রাতে ফোন দিল? অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ করেতই অপর প্রান্ত থেকে মৃত্তিকা বলে উঠল,

-তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই না? তোমায় আর কোনো কষ্ট দিবো না। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবে? আমি জানি তুমি আমার অনুরোধ রাখবে। ফেলতে পারবে না। কারণ আমার প্রতি যত রাগই ছিল না কেন, আমি কোন অনুরোধ করলে তা তুমি ফেলতে না।

-অমাকে কোন কথার বলা সুযোগ না দিয়ে এ নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো মৃত্তিকা। বললাম কি সেই অনুরোধ? বলো।

-আগামিকাল সকালে তুমি কি একটু মিডফোর্ড হাসপাতালে আসতে পারবে?

-হ্যাঁ, পারবো।

-তাহলে চলে আসো। সকালেই কথা হবে।

পরের দিন সকালে যথারীতি চলে গেলাম রাজধানীর পুরাতন ঢাকায় অবস্থিত মিডফোর্ড হাসপাতালে। অনেক কষ্টে খুঁজে বের করলাম মৃত্তিকাকে। প্রথমে দেখে চিনতে পারিনি।

হাঁসপাতালের বেডের পাশে মৃত্তিকার মা বসে আছে। আমি যাওয়া মাত্রই মৃত্তিকা তার বাবাকে ফোন দিয়ে মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে মা, বাবা তোমার সাথে কথা বলবে। তুমি একটু বাইরে যাও।

মা বাইরে যাওয়া মাত্রই কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই মৃত্তিকা হঠাৎ করে  আমাকে জড়িয়ে ধরে জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদছিল। আমি নির্বাক হয়ে ওকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরেছিলাম। অনেকক্ষণ কান্নার পর ও শান্ত হলো। মৃত্তিকা আমাকে বলল,

-আমার শেষ ইচ্ছা আমি পূর্ণ করলাম আজ। জানি না তুমি তোমার শেষ ইচ্ছা পূর্ণ করতে পারবে কিনা। আমি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কোনো কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এরই মধ্যে মৃত্তিকার মা ক্যাবিনে চলে আসে। আমাকে উদ্দেশে করে বলেন,

-বাবা তুমি আমার মেয়ের পাশে থাকলে হয়তো আমার মেয়ের আজ এই অবস্থা হতো না। মৃত্তিকা বাংলাদেশের আসার পরে আমাকে সব বলেছে। তুমি ওর ভালোর জন্য কত কিছুই না করেছো। আমাকেও একবার বলেছে তুমি নাকি ওকে অনেক বকা দিতে না খেয়ে থাকার জন্য। কিন্তু আজ না খেয়ে থাকার জন্যই আজ আমাদের মধ্যে থেকে আমাদের মৃত্তিকা চলে যাচ্ছে।

-আমি সান্ত্বনা দেবার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।

– মৃত্তিকার মা এবার অনেকটা অনুরোধ করে বললেন,

– বাবা, তুমি আমার মেয়েটার পাশে জীবনের শেষ সময়টুকুতে একটু থাকবে?

-কোনো কিছু চিন্তা না করেই বলে দিলাম, হ্যাঁ।
– মৃত্তিকা তার মাকে বলল,

– মা, বিদায় বেলায় তুমি কি আমার একটা অনুরোধ রাখবে? তোমাদের সমাজ, সংসার, ধর্মের কারণে আমি অনিমেষের কোলে কখনো ঘুমাতে পারিনি। আজ আমি ওর কোলে একটু ঘুমাতে চাই। প্লিজ মা। না করো না।

-মা মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে ওদের দুজনকে ক্যাবিনে রেখে বাইরে চলে যান।

-মৃত্তিকা আমার কোলে মাথা রেখে বলল, এই দুষ্টু আমার কপালে একটা চুমু দাও না!

-মৃত্তিকার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিতেই এক স্বর্গীয় সুখের প্রশান্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলে। সে যে বন্ধ করে আর চোখ খোলেনি।

তখন আমার দু’চোখ থেকে মৃত্তিকার গালের উপর গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোটা গরম জল।

এর পর দেখতে পেলাম একমাত্র মেয়ের জন্য মায়ের কত বেদনা মৃত্তিকা বাবা গ্রামে থাকার কারণে অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে, হাসপাতলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রওনা হলাম গ্রামের দিকে তখন বাজে রাত ১২টা ৩৮ মিনিট।

বি.দ্র. গল্পটি এর আগে ‘মাসিক মনোজগত’ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল।

লেখক : গল্পকার, কবি ও সাংবাদিক, জাতীয় দৈনিক নতুন সময়।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...