সম বণ্টন
লেখক সুরাইয়া শারমিন (ছবি: সংগৃহীত)

সুরাইয়া শারমিন 

শাহানা বেগমের বয়স ষাট বছর। তার এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিন বছর আগে। আর ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন তাও প্রায় পাঁচ বছর হবে।

শাহানা বেগম কখনো ছেলে আর মেয়ের মধ্যে কোন রকম বৈষম্যমূলক আচরণ করতেন না। তিনি সব সময় চেষ্টা করতেন ছেলে আর মেয়েকে সব বিষয়ে সমান সুযোগ দিতে।

ছেলে তমালকে বিয়ে করানোর আগেই, তার মেয়ে তৃণাকে বিয়ে দেয়ার কথা অনেকে বললেও, তিনি আগে ছেলেকে বিয়ে করান। তার মতে ছেলে বড়। ছেলের বিয়ে আগে হবে। ঘরে বউ আসবে, কত আনন্দ হবে। তারপর মেয়ের পড়া শেষ হলে, মেয়ে কোন জবে ঢুকতে চাইলে ঢুকবে, তার পর মেয়েকে বিয়ে দিবেন।

>> এই লেখকের আরো গল্প পড়ুন : ইভটিজিং

ছেলেকে বিয়ে করানোর পেছনে আরো একটা কারণ অবশ্য আছে। তা হলো তমাল যে মেয়েকে পছন্দ করে,সেই মেয়ের বাবা-মা মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। তাদের বক্তব্য মেয়ে বিয়ে দিতে হয় পড়াশোনা শেষ করার আগেই। তা না হলে মেয়ের বয়স হয়ে গেলে, ভালো পাত্র পাওয়া মুসকিল।

শাহানা বেগম শুধুমাত্র ছেলের পছন্দের বিষয় মাথায় রেখে এই বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। তবে তিনি বিয়ের কথা পাকা করার সময় মেয়েকে আংটি পরাতে পারাতে বলেছিলো, মা আমি চাই তুমি লেখা পড়াটা শেষ করবে বিয়ের পরে। তোমার পড়ালেখার সব দায়িত্ব আমি নিবো।

তমালের বউ নাজিয়া বউ হয়ে আসার কিছু দিন পর থেকেই, শাশুড়ির সাথে গল্পের সময় ননদ তৃণার বিয়ে দেওয়া নিয়ে কথা বলতো, এটা শাহানা বেগম একদম পছন্দ করতো না।

একদিন নাজিয়া তার শাশুড়ি মাকে বলে, মা, আমার আম্মার হাতে একজন ভালো ঘটক আছে, আম্মা বলছিলো তৃণার একটা ছবি আর বায়োডাটা দিয়ে রাখতে, ভালো ছেলে পেলে আপনাকে জানাবে।

তখন শাহানা বেগম যথেষ্ট পরিমানে বিরক্ত হয় এবং সোজাসাপ্টা নাজিয়াকে বলে, নাজিয়া শোন, বেয়াইনকে বলবে, আমি এখনো তৃণার বিয়ের কথা ভাবছি না। তৃণা আগে পড়াশোনা শেষ করবে, কিছু একটা কাজ শুরু করবে, তারপর ওর বিয়ের বিষয় নিয়ে ভাববো আমরা। আর তৃণারও পছন্দ-অপছন্দ থাকতে পারে বিয়ের বিষয়ে।

শাহানা বেগম তমালের বিয়ের সময় থেকেই বুঝতে পারছিলো, নাজিয়াদের বাসার মানুষগুলোর সাথে তাদের মনমানসিকতা সাথে মিলের চাইতে অমিল বেশি। নাজিয়া পড়াশোনা শেষ করার আগেই প্রেগন্যান্ট হয়ে যায়। তারপর আর পড়া শেষ করলো না।

তৃণার বিয়ে হয়েছে এটা ঠিক, তাই বলে সে তার নিজের বাড়ির অধিকার হারিয়েছে, এটা ভাবছো কেন? তৃণা যদি বিদেশেও চলে যায়, তার পরেও তৃণার এই বাড়িতে যা যেমন ছিলো তেমনই থাকবে। আর তৃণার কোন কিছুতে কেউ কখনো, ওর অনুমতি নিয়েও হাত দিবে না। কারণ তৃণা বা তোমার কোন কিছু এখন পর্যন্ত তোমরা কেউ করো নাই। তোমাদের বানানো সম্পদ তোমরা কে কি করবে তা তোমাদের মর্জি অনুযায়ী হবে।

শাহানা বেগমও খুশি হয় নতুন অতিথি আসার সংবাদে। সে যথেষ্ট কেয়ারিং নাজিয়ার বিষয়ে। তারপরেও সে সব সময় খেয়াল করে। সে নাজিয়াকে যে কোন পরামর্শ দিলে, নাজিয়া তার মায়ের সাথে আগে কথা বলে সে বিষয়ে। এই বিষয়টা তার ভালো লাগে না।নাজিয়ার মা-বাবা এই খবরে খুবই খুশি। তাদের কথা, এটাই মেয়েদের বাচ্চা নেওয়া সঠিক সময়। আর এত পড়ালেখা করে কি হবে? তাদের মেয়ের তো আর চাকরি করতে হবে না। তমাল একমাত্র ছেলে ভালো চাকরি করে।

আবার সে এটাও ভাবে তার মেয়েও কি তার সাথে এমনটা করবে? হয়তো বা করবে। বউ শাশুড়ির সম্পর্কটা এই যুগে এসেও কেন আরো বেশি ভরসার জায়গা হারাচ্ছে?

তৃণার বিয়ের সময় তমালের বিয়ের সমান টাকা খরচ করা হয়েছে। সেই সময়ও তিনি খেয়াল করেছেন কেনাকাটার সময় নাজিয়া কেমন জানি মুখ ভার করে ছিলো। তৃণার বিয়ের শাড়ি কেনার সময় নাজিয়া বলেই ফেলে, -মা তৃণার বিয়ের শাড়ি কি আমরা দিবো? ওর বরের বাড়ি থেকে আসবে না?

তখন শাহানা বেগম খুবই বিরক্ত হয়ে বলে, শোন নাজিয়া, আমি তমাল আর তৃণার বিয়ের খরচের টাকা সমান দুই ভাগ করে রেখে দিয়েছিলাম। তমালের বিয়েতে তমালের জন্য রাখা টাকা খরচ করেছি এখন তৃণার বিয়ের এখন তৃণার জন্য রাখা টাকা খরচ করছি।

তৃণার শ্বশুর বাড়ির থেকে যে শাড়ি আসবে সেটার সাথে আমাদের দেওয়া শাড়ির কি সম্পর্ক? ওদের দুভাই বোনকে আমার সাধ্য অনুযায়ী আমি এক সমান দিবো, তার পরে ওরা ওদের সাধ্য অনুযায়ী চলবে।

আজকের এই সংকটের শুরু অনেক দিন আগে থেকেই। এই সমাজ তার সুবিধা অনুযায়ী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির বিজ সমাজের গভীরে বুনে দেওয়া হয়েছে। ছেলে আর মেয়েকে ভিন্ন চোখে দেখার রীতি। যা শাহানা বেগম তার বেলায় দেখেছেন তার বাবার বাড়িতে।

উনিশ বছর আগের কথা। তমালের বাবার এক বন্ধু একদিন বাসায় এসে, একটা জায়গা বিক্রি হবে বলে জানায়। সাথে আরো জানায় জায়গাটায় কোন ভেজাল নাই। আর দাম বাজার দরের চাইতে কম।

শাহানা বেগমরা তখন থাকেন সরকারি কোয়ার্টারে। তার মনে সব সময়ই একটা ছোট্ট নিজের বাড়ির শখ। সে তখন তমালের বাবাকে বলে তুমি জায়গার বায়না দিয়ে দাও। আমাদের টুকটাক সঞ্চয় আর তুমি একটা লোনের জন্য দরখাস্ত করো।

তার পরেও সব কিছু মিলিয়ে টাকার টান হয়। তখন শাহানা বেগম তার বাবার বাসায় গিয়ে বাকি টাকাটা চায়। শাহানা বেগমের বাবার বাড়ির অবস্থা খুবই ভালো না হলেও তারা যথেষ্ট পরিমানে স্বচ্ছল ছিলো। তাদের ঢাকার মধ্যে দুইটা বাড়ি এবং দুটো বাড়ির বাড়া যথেষ্ট।

কিন্তু সে টাকা চাইতে গেলে তাকে বিভিন্ন রকমের লোন দেখানো হয়, তখন সে এক সময় রাগ করে বলে ফেলে, এই বাড়িতে আমারও অংশ আছে আমার ভাগ আমাকে বুঝিয়ে দাও। তার পরে সবার আসল রুপ বের হয়।

তার আব্বা-আম্মা অবাক হয়। মেয়েকে বলতে থাকে, দুই বাড়ি তাদের দুই ছেলের জন্য আর ছেলেরা তাদের দুই বোনকে দেখবে। তারা ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে আসবে। সারাবছর খাবে বেড়াবে আর বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিয়ে গেলে সেখানে আর মেয়েদের কোন হক থাকে না বেড়ানোর। তখন তো ভাইরা একদিনও বোনকে দেখবে না।

তারা আরো বলে, তোমার বিয়ের সময় তোমার ভাগের টাকা খরচ করা শেষ। শাহানা বেগম খুবই রাগী মানুষ। সে শুধু তার বাবা-মাকে বলে আসে, যে বাবা-মা তার সব সন্তানকে এক চোখে দেখতে পারে না, তাদের মেয়ে সন্তান জন্ম না দেওয়াই ভালো।

তার পরে বাসায় এসে সে অনেক কান্না-কাটি করে এবং তার বিয়ের সময়ের সব গয়না বাবার বাড়ির, শ্বশুর বাড়ির এবং সে নিজে টাকা জমিয়ে কিছু গয়না বানায় সব বিক্রি করে দিয়ে জায়গাটা কিনে। সেই সময় টুকটাক লোনও করে তাদের কেনা জায়গায় কয়েকটা টিনের ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়ে দেয়। আর জায়গা কেনা হয় তাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের নামে। আর ঘর ভাড়ার টাকা দিয়েই দুই বছরের মধ্যে তার লোন পরিশোধ হয়ে যায়।

কিন্তু সে তার বাবার বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সে তার ছেলে-মেয়েকে কখনো আলাদা চোখে দেখবে না। তাদের যেটুকু যা আছে তা সব সময় দুই ভাগ হবে সমান করে।

সেই টিনের বাড়ির ভাড়া দিয়ে সে তার সন্তানদের সব চাহিদা মিটিয়েছে। একসময় এসে তমালের বাবা যখন সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিবে, তার দুই বছর আগে নিজেদের বাড়ির কাজে হাত দেয়। আজ সেই বাড়ি এখন পাঁচ তলা করেছে।

তৃণার বিয়ের ছয়মাস পরে একদিন বিকেলে সবাই টেবিলে বসে চা খাচ্ছিলো, এমন সময় তমাল তার মা-বাবাকে উদেশ্য করে বলে,
-আম্মা তৃণার রুমটাতো অনেক বড় আর ওতো এখন শ্বশুর বাড়ি চলে গেছে এত বড় রুম ফেলে রাখার কি দরকার? আমি ভাবছি আমার আর তৃণার রুমতো পাশাপাশি, মাঝখানের দেয়ালটা ভেঙে আমাদের রুমটা বড় করে নিবো, যা খরচ হবে তা আমি দিবো, তোমরা কি বলো?

শাহানা বেগম ছেলের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। তার পর কঠিন গলায় বলে দেন।
-তৃণার বিয়ে হয়েছে এটা ঠিক, তাই বলে সে তার নিজের বাড়ির অধিকার হারিয়েছে, এটা ভাবছো কেন? তৃণা যদি বিদেশেও চলে যায়, তার পরেও তৃণার এই বাড়িতে যা যেমন ছিলো তেমনই থাকবে।

আর তৃণার কোন কিছুতে কেউ কখনো, ওর অনুমতি নিয়েও হাত দিবে না। কারণ তৃণা বা তোমার কোন কিছু এখন পর্যন্ত তোমরা কেউ করো নাই। তোমাদের বানানো সম্পদ তোমরা কে কি করবে তা তোমাদের মর্জি অনুযায়ী হবে।

সেই দিন শাহানা বেগম তার ছেলের চোখে এক ধরনের স্বার্থপরতা দেখে, যা তিনি তার ভাইদের মধ্যে দেখেছিলো। সেদিন তার সাথে তার বাবা-মা ছিলো না, তারাও শুধু তাদের ছেলেদের স্বাথর্ রক্ষা করেছে।

সেই ঘটনার পর থেকে তমাল বেশ কয়েকদিন মুখ ভার করে ছিলো তখন তমালের বাবা খুব আপসেট হয়ে বলেছিলো,
-শাহানা কি করা যায় বলো তো, ছেলের তো মন খারাপ হয়ে আছে। হয়তো বাচ্চা নিয়ে আর একটু বড় খোলামেলা ঘরে থাকতে মন চাইছিলো তাই রুমটা বড় করতে চেয়েছে।

তখন শাহানা বেগম বলে,
-কোন সমস্যা নাই ওকে বলো তিন তলার ভাড়াটিয়া তুলে দিয়ে তিনতলা ওর মনের মতো করে নিতে।
-এটা কি বললে তমালের মা তখন তো ওরা আলাদা হয়ে যাবে!

-একসাথে থেকে যদি ভালো না থাকা যায়, তবে ওরা আলাদা থাকবে। ওদের মতো করে থাকবে এটাই ভালো।

– আর শোন এই বাড়ি করার সময়ই তো আমরা ভাগ বটোয়ারা করে ফেলেছি তাই না?

-আমি আমার সন্তানদের মনে কখনো কষ্ট দিবো না। ওরা সব কিছু এক সমান পাবে, তার পরেও যদি আমাদের ফয়সালায় ছেলে অখুশি হয়, তবে বুঝতে হবে ছেলেকে আমি আমার শিক্ষায় বড় করতে পারি নাই।

আমাদের সমাজে এখনো মেয়েরা কেন এত অসহায় জানো? এর কারণ হলো, আমরা পরিবার থেকেই শুরু করি ছেলে-মেয়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। একটা মেয়ে যদি তার পরিবারেই সমান অধিকার না পায়, তবে বাহিরের সমাজে সে কি আাশা করবে? আমরা অন্তত আমাদের সন্তানদের মধ্যে কোন, বিভেদ তৈরি না করি।

লেখক : গল্পকার, লেখক ও উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...