সামিয়া ফারাহ্’র কপালে সেই সুখ সয়নি বেশি দিন

উজ্জ্বল এ গমেজ

অনার্স-মাস্টার্স পাস করা প্রত্যেক নারীর স্বপ্ন থাকে একটা ভাল চাকরি করার। এরপর স্বপ্নের রাজপুত্রের হাত ধরে সংসার নামক সুন্দর একটা ফুলের বাগান করার। যেখানে দুজনের নিবিড় যত্নে ফুটবে ভালোবাসার ফুল। ফুলের যত্ন আর দুজনে ভালোবাসার খুনসুটি করতে করতে কেটে যাবে জীবনের মধুর দিনগুলো।

অন্য পাঁচটা নারীর মতো সামিয়া ফারাহ্’র স্বপ্নও ছিল এমন রঙিন। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে পেলেনও স্বপ্নের রাজপুত্রের দেখা। হৃদয়ের সমস্ত দরদ দিয়ে আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে, অত্যন্ত যত্ন করে নিজ হাতে গড়েছিলেন সুন্দর একটা ফুলের বাগান। ওই বাগানে একটা গোলাপও ফুটেছে তার। কিন্তু ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হয়নি। তাই কপালে সে সুখ সয়নি তার বেশি দিন।

আচমকা এক কালবৈশাখি ঝড়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় তার সাজানো-গোছানো সংসার নামক স্বপ্নের বাগানটি। অসিম ধৈর্য আর পরম মমতা নিয়ে আবার শুরু করেন বাগানটিকে সাজাতে। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। শেষে জীবনের কঠিন বাস্তবতায় এসে তাকে বেছে নিতে হলো সিঙ্গেল মাদার লাইফ। জীবন পথে বারবার হোঁচট খেয়েও দমে যাননি ফারাহ্। ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এখন তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা।

অনলাইন প্লাটফর্ম ‘ফারাহ্ ওয়ার্ল্ড’-এর স্বত্বাধিকারী সামিয়া ফারাহ্’র জীবনের পদে পদে রয়েছে নানান ঘাত-প্রতিঘাত। সে গল্প জানতে হলে যেতে হবে আরো অনেক পেছনে।

সামিয়া ফারাহ্’র জন্ম রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক ধনাঢ্য পরিবারে। ডাক নাম শাওন। দুইবোনের মধ্যে শাওন বড়। বাবা উচ্চপদস্ত সরকারি কর্মকর্তা। মা সুগৃহিনী। নানু ও দাদু বাড়ির একমাত্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল শাওন। পরিবারের বাকি সদস্যরাও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খুব ভালো অবস্থানে ছিলেন। মাস্টার্স পাস করা পর্যন্ত তার জীবন ছিল রূপকথা গল্পের মতো।

নিজের ক্যারিয়ারের বিষয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না শাওন। ছোটবেলায় জানতেন হয় ডাক্তার নয়তো ইঞ্জিনিয়ার, আর নয়তো শিক্ষক বা ব্যাংকারের মধ্যেই ক্যারিয়ার গড়তে হবে।

পড়ালেখায় বরাবরই ভালো ছিলেন শাওন। নিজের অবহেলার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হলো না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। মাস্টার্স পরীক্ষার পর রেজাল্ট বের হওয়ার সময়টাতে ধানমন্ডিতে বাসার কাছেই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শুরু করেন খণ্ডকালিন শিক্ষকতা। সেই সাথে চললো বিসিএসর প্রস্তুতি। এদিকে পরিবারে থেকে শুরু করলো সুপাত্র খোঁজা। এবার ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলো দ্রুত। কিছুদিনের মধ্যেই ধুমধাম করে হয়ে গেলো বিয়ে। পাত্র নামকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পদস্থ চাকুরে। শ্বশুরবাড়ি বনানী হওয়াতে স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিতে হলো। শুধু চলতে থাকলো বিসিএসর প্রস্তুতি।

বিয়ের পর শাওনের খুব শখ ছিল একটা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার। সবার যেমন একটা আইডেনটিটি আছে, তেমনি তারও চাই একটা আইডেনটিটি। অনেকটা অবাক করে দিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই শাওনের চাকরি হয়ে গেল স্ট্যান্ডার্ড চ্যাটার্ড ব্যাংকে। শখ পূরণ হলো। কিন্তু বিধিবাম। শ্বশুরবাড়ির লোকজন ছিলেন এক্সট্রিমলি কনজারভেটিভ। তাই বিষয়টা সহজভাবে নিলেন না তারা। কোনোভাবেই সহযোগিতা করলেন না। এরমধ্যেই নিজের ভেতর ছেলের অস্তিত্ব টের পান শাওন। বাধ্য হয়েই ছাড়তে হলো সোনার হরিণ নামক চাকরি। খুব মন খারাপ হলেও সহজে মেনে নেন বিষয়টা। নিজের সন্তানকে সময় দেবেন, চাকরি করলে সেটা সহজ হবে না। এসব ভেবে নিজেকেই নিজে সান্ত্বনা দেন।প্রকৃতির নিয়মে শাওনের কোল আলো করে এলো রাজপুত্র। নাম রাখলেন তাহযীব আনোয়ার আরনান। ওকে নিয়েই কেটে যাচ্ছিল তার দিন-রাত। শাওনের ভাষায়, আমার হাসব্যান্ড প্রচণ্ড স্বল্পভাষী ও ব্যস্ত মানুষ। ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও একধরনের বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করলাম। আমি বরাবরই শান্ত, নির্বিবাদ মানুষ। সহজে নিজের কোনো সমস্যার কথা কাউকে বলি না।

ছোটবেলা থেকেই ফ্যাশন সচেতন ছিলেন শাওন। রেডিমেড কাপড় খুব একটা পরতে চাইতেন না। চাঁদনী চক থেকে নিজে গজ কাপড় কিনে নানানরকম ডিজাইন দিয়ে ড্রেস বানাতেন। তার পরনের জামা অন্য কারো সাথে মিলতে পারবে না। সেটা অবশ্যই হতে হবে ইউনিক। ডিজাইনার ক্লদিংয়ে ছিল তার অদ্ভুত আগ্রহ। স্বভাবতই সেগুলো অনেক এক্সপেন্সিভ হতো। ২/৩ টা জামার টাকা জমিয়ে সেগুলো কিনতেন।

সেই ফ্যাশনপ্রিয় নারীটি আজ শ্বশুরালয়ে ঘরবন্দি জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থা বুঝতে পারলো তার একমাত্র ছোট বোন। সেই পরামর্শ দিল তাকে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে কাজ শুরু করতে। এছাড়াও ছোটবেলা থেকেই নিজের পোশাকে নিজে নকশা করা, পছন্দের মতো করে বানিয়ে পরা, ফ্যাশনের প্রতি এই ভালোবাসাই তাকে আজ ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের পথে হাঁটতে প্রেরণা জুগিয়েছে।

একটা ডায়েরিতে ডিজাইনের স্কেচিং শুরু করেন শাওন। তার অনেক শখের মধ্যে একটা ছিল দেশ-বিদেশের নানান রকমের পত্রিকা জমানো। সেগুলো আইডিয়া পেতে তাকে খুব সাহায্য করলো। অন্যদিকে ছেলেও খুব রাত জাগতো। সে সময়টাও কৌশলে কাজে লাগান তিনি। শাওন সব সময়ই ভাবতেন যাই করি না কেন নিজের টাকায়, নিজের চেষ্টাতেই সেটা করবো। তাই নিজের জমানো মাত্র ৫০০০ টাকা দিয়ে আল্লাহর নামে একাই শুরু করেন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের শুভযাত্রা।

আম্মুর কাছে ছেলেকে রেখে লোকাল মার্কেট ঘুরে ঘুরে কিছু পছন্দের কাপড় কিনেন তরুণ এই উদ্যোক্তা। খুঁজে খুঁজে অভিজ্ঞ কারিগর বের করে নিজের করা ডিজাইনে বেশকিছু ড্রেস বানান। সেগুলো ফ্যামিলি এবং বন্ধুদের মাঝে খুব প্রশংসিত হয়। বিক্রিও হয়ে গেলো দ্রুত। এতে শাওনের উৎসাহ বেড়ে গেল দ্বিগুণ।

যে কোনো উদ্যোগকে সফলতার মুখ দেখাতে হলে প্রয়োজন সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের। শাওন ভাবলেন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে যেহেতু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, তাই একটা ডিপ্লোমা কোর্স করা ভীষণ দরকার। যেই ভাবা সেই কাজ। ভর্তি হয়ে যান ধানমন্ডির রেডিয়েন্ট ফ্যাশন ইন্সটিটিউটে। শুরু করেন খুব আগ্রহ নিয়ে। প্রথম পরীক্ষায় প্রথম স্থান।

আবারও বিধিবাম। একদিন শাওন ক্লাসে থাকা অবস্থায় ছেলের জ্বর আসে। ফোন সাইলেন্ট থাকায় শ্বশুরের ফোন শুনতে পাননি। পরে শ্বশুর তার আম্মুকে ফোন করে অভিযোগ করেন। মায়ের কাছে বিষয়টা শুনে শাওনের খুব অভিমান হয়। সেদিনের পর আর যাননি ক্লাসে। রেডিয়েন্টের চেয়ারম্যান নাসরিন ম্যাম খুব মন খারাপ করেন। আজও কোথাও দেখা হলে ম্যাম তাকে জড়িয়ে ধরেন।

কিছুদিন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখলেন। হয়তো ছেড়েই দিতেন। আবারো ছোট বোন তার সুচিন্তিত পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে আসলো। তাকে বলল, তোমার ফ্যাশন সেন্স তো গড গিফটেড। যতটুকু শিখেছো সেটা দিয়েই শুরু করো। দেখবা তোমাকে কেউ আটকাতে পারবে না। আবারও কাজ শুরু করলেন শাওন। এবারও খুব ভালো সাড়া পেতে শুরু করেন। ২০১১ সালে ওই ছোট বোনই ফেসবুকে একটা পেজ খুলে দিল। পেজের নাম দেয়া হয় ‘Farah’s World’। তার আগ পর্যন্ত সব পরিচিত মানুষরা শাওনের ক্লায়েন্ট ছিলেন। পেজ খোলার পর ধীরে ধীরে ক্লায়েন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকল।

ছেলের সাথে সাথে বড় হতে লাগলো স্বপ্নের ব্যবসাও। দেশের বাইরে আসতে শুরু করলো প্রচুর অর্ডার। এক হাতে সব সামলাতেন শাওন। তখন ব্যস্ত সময় যাচ্ছিল তার। কিন্তু এই ব্যস্ততা অনেকেরই ভালো লাগলো না। হাসব্যান্ড সুপ্রতিষ্ঠিত কোম্পানির ডেপুটি ম্যান্যাজিং ডিরেক্টর। তাও কেন তাকে ব্যবসা করতে হবে। কেন তার এত টাকার লোভ। কেন শুধু সংসারে মন দিচ্ছেন না, ইত্যাদি… এসব কথায় শক্ত হয়ে গেলেন শাওন।

সংগ্রামী এই উদ্যোক্তার ভাষ্য, আমিও একটা মানুষ। আমারো আইডেন্টিটি দরকার আছে। আমার মধ্যে সৃজনশীলতা আছে। আমি কেন বসে থাকবো? আর যেখানে শুধু কাপড় কালেকশান বাদে বাকি সব কাজই বাসায় বসেই করতে পারছি, তাহলে কেন নয়? সংসারকে প্রায়োরিটি দিয়েই সব কাজ করছিলাম। কিছুদিন পর অনেক যুদ্ধ করে তার বাসার নিচে একটা শোরুম চালু করলেন। স্বপ্নে যোগ হলো নতুন পালক। শোরুম সামলাতে রাখেন একটা মেয়ে। ভালোই চলছিল সবকিছু। দিনগুলো যাচ্ছিল তার ভীষণ ব্যস্ততায়।

হঠাৎ একদিন বিনা মেঘে হলো বজ্রপাত। তার হাসব্যান্ড হলেন চাকরিচ্যুত। একের পর এক ঘটতে লাগলো অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। শাওন জানতে পারেন তার হাসব্যান্ড মাদকাসক্ত। উনার মাথায় প্রায় ৭০ লাখ টাকার লোনের বোঝা। এত টাকা উনি কোথায় কি করেছেন নেই কোনো সদুত্তর। এক মাসের মাথায় তার ফুলের বাগানের মতো সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেলো। ক্রমাগত লোন পরিশোধের জন্য চাপ আসতে থাকলো। দুটো গাড়িই বিক্রি করে দেয়া হলো। তার যত জমানো টাকা, যত গহনা সব দেয়া হলো। তার আব্বু আম্মু, বোন, মামা, নানা-নানু সবাই যার যার সাধ্যমতো সাহায্য করলেন। কিন্তু ৭০ লাখ টাকা তো আর চাইলেই পরিশোধ করে দেয়া যায় না। তার শ্বশুরও ঢাকায় উনার জমি বিক্রি করে দিলেন।

পরিস্থিতির চাপে মানসিক ভারসাম্য হারান শাওনের হাসব্যান্ড। রিহ্যাবে দেয়া হলো। শুরু হলো আরেক অনিশ্চিত জীবন। এদিকে শাওন ছেলেকে নিয়ে চলে যান আব্বু-আম্মু র কাছে। কি সব দিন পার করছেন বলার মতো না। যে মানুষ সারাজীবন প্রাডো গাড়িতে চড়ে চলাফেরা করেছেন, সে কিনা আজ লেগুনাতে চড়ে হাসব্যান্ডের জন্য নিয়ে যান খাবার। দুই বছরে হাসব্যান্ডকে ৪/৫ বার দেয়া হয় রিহ্যাবে। প্রতিমাসে খরচ ছিল এক লাখ বিশ হাজার। কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন না।

হাসব্যান্ড রিহ্যাব থেকে ফিরলে শাওনের উপরে শুরু হলো মানসিক অত্যাচার। বাসাতে যতক্ষণ থাকতেন সারাক্ষণ মানসিক অত্যাচার করতেন। বাজে সন্দেহ করা, আজেবাজে কথা বলা এসব। ঠিক মত ঔষধ খেতেন না, কিছু বললেই আত্মহত্যার হুমকি দিতেন। এসব সহ্য করতে করতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন শাওন। ছেলেটাও চোখের সামনে এগুলো দেখছিল।

একদিন হঠাৎ করেই পরিস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে গেলে অসুস্থ হাসব্যান্ড পুরো বাসার কাঁচের জিনিস সব ভেঙে ফেললেন। চিৎকার চেচামেচি… আপ্যার্টম্যান্টের সব মানুষ নিচে জড়ো হয়ে গেলো। শাওনের শ্বশুরকে খবর দেয়া হলো। সাথে তার ভাসুরও আসেন। তখন উনাদের সামনে হাত জোড় করে শাওন বলেন, আমি আর পারছি না। আপনারা কিছু একটা ব্যবস্থা করেন। তখন শ্বশুরের পক্ষ থেকে সমস্যা সমাধানের জন্য তাকে আশ্বস্ত করলেন। হাসব্যান্ডকে সেখান থেকে নিয়ে আবারও রিহ্যাবে দেয়া হলো। এক বছরের মধ্যে যদি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেন তাহলে আবার নতুন করে সব শুরু করার কথা জানিয়ে দিলেন শাওন।

জীবনের প্রয়োজনের তাগিদে প্রথমবারের মতো চাকরির চেষ্টা শুরু করেন শাওন। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেরকম মন মতোও কিছু পাচ্ছিলেন না। যেগুলো মিলছিল তার বেতন ছিল ১০/১৫ হাজার টাকায়। ছেলে পড়ে ইংরেজি মাধ্যমে। ওর খরচ এবং নিজের হাত খরচ তাতে চালানো সম্ভব না। তার ছোট মামী (উনি একজন ব্যাংকার) অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে ব্যবসা শুরু করতে পুঁজির জন্য বেশকিছু টাকা ধার দিলেন। অন্যদিকে তার ছোট বোন ততদিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। স্কলারশিপ পেয়ে স্বপরিবারে অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি করতে চলে যান। শাওন আর ছেলে থাকেন আব্বু-আম্মুর কাছে।

আবার নতুন করে ব্যবসা শুরু করল উদ্যমী এই উদ্যোক্তা। এবার আর শখ করে নয়, নিজের রুজি- রোজগারের তাগিদে। প্রয়োজনের কারণে আরো বেশি সিরিয়াস, ম্যাচিউরড ও বেশি প্রফেশনাল হতে হয় তাকে। ব্যবসার মূলধন ছিল তার সততা ও ভালো ব্যবহার। খুব দ্রুতই প্রচুর ক্লায়েন্ট হয়ে গেলো। পুরনোরাও পেজ একটিভ দেখে যোগাযোগ শুরু করলেন। কাপড়ের মান নিয়ে কখনোই কম্প্রোমাইজ করেন না কৌশলী এই উদ্যোক্তা। ব্যবসার কৌশল হিসেবে আফটার সেল সার্ভিসকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন। একজন কাস্টমার কাপড় কিনলেন, টাকা পেয়ে গেলেন, বিষয়টা সেখানেই শেষ নয়। তার নীতি অনুযায়ী সেখানেই ব্যবসাটা শুরু।

মা-ছেলের ছোট্ট সংসার। জীবন চলতে থাকলো বেশ ভালই। শাওনের জীবনযুদ্ধের একমাত্র অবলম্বন তার ছেলে। এত ছোট হয়েও অসম্ভব সাপোর্ট দিয়েছে মাকে। ব্যবসার কাজে কখনো মা অনেক ব্যস্ত থাকলে ছেলে নিজে থেকে খেয়ে নেয়া, ব্যাগ গুছিয়ে কোচিং ক্লাসে যাওয়া, সবকিছুই করে নিয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে দুজনে কখনো মুভি দেখতে আবার কখনোবা চলে যেতো পিজ্জা খেতে।

বছর গড়িয়ে গেল। শাওনের হাসব্যান্ড আর ঠিক হলেন না। তখন সে মন শক্ত করে ছেলের কাস্টডি ক্লেইম করে শ্বশুর বাড়িতে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিলেন। উত্তরে জানানো হলো উনারা তার ছেলের কোনো ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবেন না। মেনে নিলেন শাওন। ছেলে তার কাছে থাকবে তাতেই সে খুশি। আল্লাহ তায়ালার কাছে একটা দোয়াই করেন যাতে সে আর তার ছেলে যেন সুস্থ থাকেন।

আত্মীয়-স্বজনরা শাওনের দ্বিতীয় বিয়েকে একটা সমাধান মনে করতে শুরু করলেন। সে তাতে দ্বিমত পোষণ করেন। শুরু হলো তার ঘোষিত সিঙ্গেল মাদার লাইফ।

শাওনের এই চলার পথে পাশে পেয়েছেন তার পরিবার, কিছু ঘনিষ্ট বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তাদের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা অসীম। তারা পাশে না থাকলে হয়তো তার এই জীবন যুদ্ধটা আরো অনেক বেশি কঠিন হতো।

ব্যবসাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনার কথা জানালেন শাওন। তিনি বলেন, আল্লাহর অশেষ রহমতে, Farah’s World এখন একটা সুপরিচিত এবং বিশ্বাসযোগ্য একটা অনলাইন প্লাটফর্ম। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১১টা দেশের ক্রেতারা Farah’s World এর ডিজাইন করা কাপড় নিচ্ছে নিয়মিত। ইনশাআল্লাহ সামনে আরো ভালো কিছু হবে। একটা ফ্যাশন স্টুডিও করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেই সাথে Farah’s Worldকে একটা ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...