হাতপাখা
লেখক লিংকন কস্তা

লিংকন কস্তা

ভরা পূর্ণিমা, মধ্যরাত। প্রায় ঘন্টা খানেক হলো বিদ্যুৎ নেই। তাই প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম থাকায় ব্যালকনিতে ইজি চেয়ারটায় বসে একটানা দোল খাচ্ছে আনন্দি। অন্যদিকে আমি বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছি আর মাঝে মাঝে বলিশটাও একবার করে এপাশ-পাশ করে পাল্টিয়ে নিচ্ছি।

প্রচণ্ড গরমে যখন ঘুম আসে না, তখন বালিশের নিচের পিঠটা উল্টিয়ে উপরে নিয়ে এসে গালটা চেপে ধরলে একটা অন্যরকম ঠণ্ডা অনুভূতি লাগে। আজ আর কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। কান খাড়া করে বাইরে থেকে ভেসে আসা আনন্দির ইজি চেয়ারের শব্দ শুনচ্ছি।

ইজি চেয়ারের শব্দটা ধীরে ধীরে কমে আসছে। খুব ইচ্ছা করছে চেয়ারে দোল খাওয়া আনন্দির পাশে গিয়ে দাঁড়াই কিন্তু পারছি না। দুই বছরের দাম্পত্য-জীবনের ছোট-খাটো দোষগুলো স্বামী আর স্ত্রীর মাঝে অভিমানের যে দেয়াল আমরা গড়ে তুলেছি সেটা কেউ ভাঙতে পারছিলাম না।

অভিমান যখন স্থায়ী হয়, সেখান থেকে জন্ম নেয় দোষ আর দোষগুলো জমা করে করে গাঁথা হয় বিচ্ছেদের মালা। শুয়ে শুয়ে স্পষ্ট উপলব্ধি করছি আনন্দি কাঁদছে। খুব ভালো করেই জানি, আনন্দি যখন কান্না করে তখন চোখ মুছতে পারে না। চোখ মুছতে গিয়ে নাক মুছে।

ব্যক্তি হিসেবে আমি শান্ত প্রকৃতির। তারপরেও কিভাবে যে আজ আনন্দির গালে দুটো চড় বসিয়ে দিলাম, উফ! আর ভাবতে পারছি না। সেই যে সন্ধ্যাবেলা আনন্দির মুখটা দেখেছি, এখন প্রায় ৬ ঘন্টা পার হয়েছে, মাত্র দশহাত দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও আনন্দির মুখটি দেখা হয়নি।

জীবনে এমন একটি মুহূর্ত আসবে স্বপনেও কখনো চিন্তা করিনি। এখন আমিও যে কিভাবে আনন্দির মুখোমুখি দাঁড়াই সেটা কিছুতেই চিন্তা করে উঠতে পারছি না। আর কি কোন দিন আনন্দির চোখে চোখ রেখে তাকাতে পারবো? মনে হচ্ছে এই রাতে বোধহয় আর শেষ হবে না।

অপরাধী হাতটা এবার চোখের সমানে নিয়ে দেখতে থাকি, খুব ইচ্ছা করছে হাতটা কামড়াই তারপর আনন্দিকে ডেকে বলি নাও এবার ব্যান্ডেজ করে দাও। এমন করলে কেমন হয়, যদি আনন্দির সমানে হাত ধরে বলি, নাও জোরে জোরে কামড়ে হাতে কয়েটা দাগ বসিয়ে দাও, যেন ভাত খেতে না পারি।

আমি আর আনন্দি আর কোনো দিন মুখোমুখি হতে পারবো না। একে অন্যের প্রতি আর কোনো অভিযোগ করতে পারবো না। রাগান্বিত স্ত্রীর মন হয়েতো সোহাগে ভোলে, কিন্তু হৃদয় ভাঙ্গা স্ত্রীর হৃদয় কোন মন্ত্রে জোড়া নেবে সেটা আমার জানা নেই। তবে এটা সত্য অনুতাপের আগুন আমাকে সত্যিই পোড়াচ্ছে। আর সেই আগুনে আমরা পুড়ছি দু’জনই।

আমাদের প্রেম, অভাবের জানালা দিয়ে পালায়নি, বরং অবহেলায় মৃত্যু হয়েছে মাত্র। বরং এটাই পরিতাপের বিষয় যে, কিভাবে পরস্পর পাশাপাশি থেকেও এতো দূরে চলে গেলাম। পাশাপাশি থাকার ঊর্ধ্বের যে দাম্পত্য জীবনের প্রেমানুভূতির একটা জগৎ আছে, সেই জগতটায় আমাদের অনেক দিনই উঁকি দেয়া হয়নি।

অপরাধী হাতটা এবার চোখের সমানে নিয়ে দেখতে থাকি, খুব ইচ্ছা করছে হাতটা কামড়াই তারপর আনন্দিকে ডেকে বলি নাও এবার ব্যান্ডেজ করে দাও। এমন করলে কেমন হয়, যদি আনন্দির সমানে হাত ধরে বলি, নাও জোরে জোরে কামড়ে হাতে কয়েটা দাগ বসিয়ে দাও, যেন ভাত খেতে না পারি।

আনন্দির অশ্রু ভেজা চোখ রাগে কিভাবে জ্বলে উঠবে সেই দৃশ্যটা কল্পনা করে মুখে অজান্তে একটা হাসি চলে এলো। অন্যদিন হলে হয়তো দৃশ্যটা খুব জমতো, কিন্তু আজ তার উপযুক্ত সময় নয়। যাহোক, দৃশ্যটা অন্যভাবে সাজাতে হবে। হঠাৎ হাত চলে গেল আনন্দির বালিশের তলায়। খুঁজে পেলাম আনন্দির ভাঁজ করে রাখা হাত পাখাটা।

হাতপাখা
ভাঁজ করা হাতপাখা (ছবি: সংগৃহীত)

আনন্দির খুব প্রিয় এটা, যা আমি অজীবন আমার শত্রু ভেবে এসেছি। সংসার জীবনে যে কত জিনিস স্বামীর শত্রু হয় শুধু স্ত্রীর প্রিয় হবার কারণে সেটার কারণসহ স্বামীরা ভালোভাবেই উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা করতে পারে।

‘‘আনন্দি একটু ঝুঁকে আমার কাঁধে মাথা রাখে। চোখ জলে ছল ছল করে উঠে। ইচ্ছা করে আর জল আটকাইনি। এভাবে কান্নার মাঝেও যে একটা অন্যরকম আনন্দ আছে, প্রশান্তির ছোঁয়া আছে সেটা বন্ধ চোখে উপলব্ধি করলাম। আনন্দির কোমল একটি হাত আমার চোখের জল অলতো করে মুছে দিচ্ছে। অবাক লাগছে যে মেয়েটা নিজের চোখের জল মুছতে পারে না, সেই মেয়েটি কি যত্ন করেই না আমার চোখের জল মুছে দিচ্ছে।’’

এই যেমন লোকভর্তি লোকাল বাসে পাশাপাশি সিটে বসে সকলের সমানে হাত পাখাটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে নাও এবার বাতাস করো, খুব গরম লাগছে। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও হাত পাখাটা নিয়ে বাতাস করতে হয় প্রিয়তমা স্ত্রীকে। তারই একটু পরে আমার কাঁধে মাথা এলিয়ে দিবে আনন্দি, আর একটু পর পর মাথা তুলে বলবে একটু জোরে বাতাস করো না।

এদিকে লজ্জায় আমরা গা জ্বলে যায়, যখন দেখি বাসের সবাই আমার দিকে কৌতূহল চোখে হা করে তাকিয়ে থাকে। যেন লোকাল বাসে ভ্যাপসা গরেম স্ত্রীকে বাতাস করাও একটি আইনত দণ্ডণীয় মহাঅপরাধ।

এখন কেন জানি মন চাইছে আনন্দিকে একটু বাতাস করি। বিছানা ছেড়ে হাতপাখাটা নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াই। হাঁটু গেড়ে বসি আনন্দির ইজিচেয়ারটার পাশে। হাত পাখাটার ভাঁজ খুলে ধীরে ধীরে বাতাস করতে থাকি।

আনন্দির শুকিয়ে যাওয়া চোখে আবার নতুন করে জল ভিজে যাচ্ছে। এভাবে কেটে গেল কিছু মুহূর্ত, কিছু বলতে ইচ্ছা করছে আনন্দিকে, কিন্তু বুকে যে অপরাধের একটা পাথর চাপা দেয়া, যেটা কিছুতে সরাতে পারছি না। চারদিক সুনসান নীরবতা। হাঠাৎ প্রকৃতির সব নীরবতা ভেঙে বলে উঠি ‘আনন্দি আর একটু জোরে বাতাস করবো’?

ভালোবাসা মরে না। শুধু অযত্নে শুকিয়ে যায়। একটু মূল্য পেলে আবার সহজ হয়ে উঠে। ছোট একটি কথায় আমাদের অভিমানে দেয়াল এভাবে ভেঙে পড়বে ভাবতে পারিনি। ইজিচেয়ারের দোলাটা হঠাৎ থেমে গেলো। আনন্দির বন্ধ চোখ খুলে আমার দিকে ধীরের ধীরের চোখ মেলে চাইছে, আমিও স্থির চোখে তাকিয়ে আছি আনন্দির চোখের দিকে, এ যেন ভরা পূর্ণিমায় শুভদৃষ্টি।

আনন্দি একটু ঝুঁকে আমার কাঁধে মাথা রাখে। চোখ জলে ছল ছল করে উঠে। ইচ্ছা করে আর জল আটকাইনি। এভাবে কান্নার মাঝেও যে একটা অন্যরকম আনন্দ আছে, প্রশান্তির ছোঁয়া আছে সেটা বন্ধ চোখে উপলব্ধি করলাম। আনন্দির কোমল একটি হাত আমার চোখের জল অলতো করে মুছে দিচ্ছে। অবাক লাগছে যে মেয়েটা নিজের চোখের জল মুছতে পারে না, সেই মেয়েটি কি যত্ন করেই না আমার চোখের জল মুছে দিচ্ছে।

লেখক : মেজর সেমিনারিয়ান, ফৈলজানা, পাবনা।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...