ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

নাজনীন নাহার

ইন্টারনেটের বদৌলতে সারাবিশ্ব এখন আমাদের হাতের মুঠোয়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট এনেছে অভুতপূর্ব পরিবর্তন এবং উন্নয়ন। আজ তথ্যপ্রাপ্তি এবং জ্ঞানার্জনের এক অন্যতম মাধ্যম হলো ইন্টারনেট। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ক্রমবর্ধমান। বিশ্বের ৭ বিলিয়ন জনসংখ্যার ৫৩ শতাংশ লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তবে বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলের অনেক মানুষ এখনও ইন্টারনেট ব্যবহার করে না,অবশ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং তা সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে এমন মানুষের সংখ্যা কমছে।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল এথিক্সের লেকচারার ড. মের্টেন রেগ্লিটজ, জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড ফিলোসফিতে বলেছেন, ‌‌‘‘ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ এখন কোন বিলাসিতা নয়, বরং এটি একটি নৈতিক মানবাধিকার এবং প্রত্যেকেরই স্বাধীনভাবে এবং সেন্সরবিহীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বা অধিকার থাকা উচিত।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘প্রয়োজনীয় সর্বজনীন স্বার্থের ভিত্তিতে এটি ব্যবহারে যাদের সামর্থ্য নাই, রাষ্ট্রের উচিত তাদেরকে বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেয়া। ‍বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগকে মানবাধিকার বলেও ঘোষণা করেছে। ভারতের কেরালা রাজ্য সর্বজনীন ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে একটি মানবাধিকার বলে ঘোষণা করেছে এবং ২০১৯ সালেই তারা দেশটির ৩৫ মিলিয়ন মানুষের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারকে নিশ্চত করতে সক্ষম হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২০ সালে প্রত্যেক ইউরোপীয় গ্রাম এবং শহরে জনজীবনের প্রধান কেন্দ্রগুলিতে বিনামূল্যে তারবিহীন ইন্টারনেট অ্যাক্সেস দেওয়ার জন্য ‘ওয়াইফাই ফর ইইউ’ (WiFi4EU) উদ্যোগ চালু করেছে। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট অ্যাক্সেস হল জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ। জাতিসংঘের সদস্যদের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রগুলি উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সর্বজনীন ইন্টারনেট অ্যাক্সেস সরবরাহ করতে সহায়তা করে৷ কেননা এই ইন্টারনেটের মাধ্যমে নাগরিক সেবা প্রদান হতে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসেবা, বিনোদন, কর্মসংস্থান সবই সম্ভব। তাইতো এর ব্যবহার ক্রমবর্ধমান এবং জনপ্রিয়। গণমাধ্যমেও এর ভূমিকা আজকাল অন্য যেকোন মাধ্যম হতে জোড়ালো।’’

ইন্টারনেট মানুষকে গণতন্ত্র সম্পর্কে শিক্ষিত করে। সরকারী-বেসরকারী যে কর্মকাণ্ড ঘটে তার সর্ম্পকে আপটুডেট থাকতে ইন্টারনেট জণগনকে সাহায্য করে। সেই সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে স্বাধীন মতামত প্রকাশের জন্য ইন্টারনেট এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। অনেকের জন্য ইন্টারনেট প্রায়ই তথ্যের প্রাথমিকে উৎস। টুইটার, ফেসবুক এবং গুগলের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কগুলি নাগরিকদের সম্পৃক্ততাকে পরিবর্তন করার সম্ভাবনা রাখে।

এইভাবে মূলত, ইন্টারনেট গণতান্ত্রিক চর্চাকে উজ্জীবিত করে এবং সেই সাথে প্রভাবিত করে ব্যক্তি চিন্তাকে। তবে অপব্যবহারের ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারের উপর বিভিন্ন ধরনের বিধি-নিষেধ রয়েছে বিভিন্ন দেশে। কোথাও কোথাও অপব্যবহার রোধকল্পে প্রণীত আইন ইন্টারনেটে স্বাধীন এবং সুষ্ঠু ব্যবহারকে করেছে বাধাগ্রস্ত। বাধাগ্রস্ত হয়েছে বাক স্বাধীনতা এবং মুক্ত চিন্তা। সাধারণ মানুষ এর ব্যবহার তথা ইন্টারনেটের সুস্থ্ ব্যবহার এবং তদসংশ্লিষ্ট তথ্যাদি এবং সমস্যাগুলো না জানার কারণে একদিকে যেমন নিজ অধিকার হতে বঞ্চিত হচ্ছে, অপরদিকে অপব্যবহারের অজুহাতে প্রণীত হচ্ছে বৈষম্যমূলক আইন। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা এবং তদসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সর্ম্পকে আমাদের যথেষ্ঠ জ্ঞান থাকা উচিত।

ইন্টারনেট লিটারেসি (Internet Literacy)
আমেরিকার মিনিস্ট্রি অব ইন্টার্নাল অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ইন্টারনেট লিটারেসিকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করে বলেছে, ইন্টারনেট জ্ঞান হচ্ছে ১) সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারের সক্ষমতা ২) ইন্টারনেটে অবৈধ এবং ক্ষতিকারক বিষয়গুলি কি তা বোঝা ও তা থেকে দূরে থাকার সক্ষমতা, ৩) ইন্টারনেটের মাধ্যমে সঠিকভাবে এবং অপরকে সম্মান করে যোগাযোগ করার সক্ষমতা এবং ৪) নিজের অ্যাকাউন্টের ব্যক্তিগত তথ্যাদি গোপন রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করার সক্ষমতা ৷ অনেকের এই সক্ষমতাগুলি নেই বলেই ইন্টারনেটের অপব্যবহার বাড়ছে এবং অপব্যবহার রোধে প্রণীত আইনে সংকুচিত হচ্ছে এর স্বাধীন ব্যবহারের গণ্ডি।

বাংলাদেশে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু ১৯৯৬ সালে। প্রথম দিকে এর ব্যবহার রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সূচনা এবং মোবাইল ইন্টারনেটের সুবাদে এখন প্রায় সারা দেশেই রয়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। দেশের কোটি লোক ইন্টারনেট ব্যবহার করে কিন্তু কজন এর ঝুঁকি, নৈতিকতা, এ সংক্রান্ত আইন ইত্যাদি সম্পর্কে জানে? শুধুমাত্র মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানোর ‘অপরাধে’ অনেককেই পেতে হয়েছে আইনের শাস্তি। ইন্টারনেটে হয়রানি, রিপোর্ট করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা, যুবসমাজের উপর পর্ণোগ্রাফির করাল গ্রাস, গালাগালি, অশ্লীলতা ইত্যাদি অপব্যবহারের উদাহরণ প্রচুর৷ এসবের অন্যতম কারণ হচ্ছে দেশে ইন্টারনেট লিটারেসি বা ইন্টারনেট বিষয়ক জ্ঞানের অভাব।

ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা কি?
ইন্টারনেট স্বাধীনতা- এই শব্দবন্ধের মধ্যে ডিজিটাল অধিকার, তথ্যের স্বাধীনতা, ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার, ইন্টারনেট সেন্সরশিপ থেকে স্বাধীনতা এবং নেটনিরপেক্ষতার ধারণা অন্তর্ভুক্ত। একটি সুস্থ গণতন্ত্র এবং শক্তিশালী নাগরিক সমাজের জন্য বাক স্বাধীনতা জরুরি, জরুরি তার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলনের স্বাধীনতা আর মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা এবং নেটনিরপেক্ষতা অপরিহার্য।

সারা বিশ্বে মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া আজ একটি বড় শক্তি। বিশেষ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান আমেরিকানদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক পুলিশি সহিংসতা এবং #MeToo প্রচারাভিযান প্রমাণ করে এই মিডিয়া কতটা শক্তিশালী বিশ্বব্যাপী। তাই এর স্বাধীন ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর অবাধ ব্যবহার অনেকসময় বিপদজনক, তাই সব দেশেই রয়েছে এর নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। সমস্যা হচ্ছে অপব্যবহার রোধে নিয়ন্ত্রণ কোথাও কোথাও বাধাগ্রস্ত করছে মতপ্রকাশের ন্যূনতম স্বাধীনতাকেও।

ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ কি ? ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রক কেন প্রয়োজন?
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের অর্থ হলো নির্দিষ্ট ধরণের ডেটা ব্যবহার বা অ্যাক্সেস করাকে নিয়ন্ত্রিত করা বা সীমাবদ্ধতা তৈরি করা। সহজ কথায় অবাধ ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণ করা। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীদের সংবেদনশীল বা ক্ষতিকর বিষয়বস্তু দেখা থেকে বিরত রাখা, কপিরাইটযুক্ত তথ্যে অ্যাক্সেস পেতে বাধা দেয়া, ব্যবহারকারীদের আচরণ নিরীক্ষণসহ সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ইন্টারনেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কি সত্যি প্রয়োজন?
ইন্টারনেটে প্রতিদিন লাখো লাখো তথ্য আপলোড হয়, যার মধ্যে এমন তথ্যও থাকে যা কারোরই দেখা উচিত নয়। এটা অনেক ক্ষেত্রে বিপদজনকও হতে পারে, বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য। এজন্য ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় যাতে করে তথ্য উপাত্ত যাচাই বাছা্ই করে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অন্যথায়, ব্যবহারকারীরা অনলাইনে কোন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডেরে সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে যা ব্যক্তি, সমাজ, ধর্ম বা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি স্বরূপ। ইন্টারনটে অনেক সময় ভুল তথ্য শেয়ার করার মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াবার সুযোগ থাকে। এই কারণেই অনেক দেশ অনলাইনে, বিশেষ করে ফেসবুকে ব্যবহৃত তথ্য এবং বিষয়বস্তু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

এছাড়াও ইন্টারনেটের মিথ্যা বিজ্ঞাপনের মতো ঘটনা, প্রতারণামূলক যোগাযোগ এবং ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান, ক্ষতিকারক কার্যকলাপ বন্ধ করা, পরিচয় লুকিয়ে তথ্য চুরির বিরুদ্ধে উপাত্ত রক্ষা করা, হ্যাকিং রোধ করা ইত্যাদি কারণেও ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, বাংলাদেশে ডিজিটাল আইন প্রণয়নের কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল- সাইবার ক্রাইমের আধিক্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ আইন করার প্রয়োজন হয়েছে। আগে সাইবার ক্রাইমের জন্য কোনো আইন ছিল না। এখন এ জাতীয় সব অপরাধের বিচার এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। তাই বলে কি সাধারণ নাগরিকের মতামত প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে? নিশ্চয়ই না। কারণ বর্তমানে মতপ্রকাশের এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ইন্টারনেট।

বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যাবহারের নিয়ন্ত্রণ এবং আইন
ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকে সরকার। প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইন্টারনেট আইন আছে এক এক রকমের, যে কারণে কিছু দেশে অন্য দেশের তুলনায় কনটেন্ট এবং তথ্য ব্যবহার করা সহজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কয়েকটি সংস্থা রয়েছে যারা ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে। মূলত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই সারাবিশ্বে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব আইন বা রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ যাদের কাজ সুষ্ঠু এবং গুণগতমানের ইন্টারনেট সরবরাহ করা, তদারকি করা এবং প্রয়োজনে তা নিয়ন্ত্রণ করা। তবে তা গণহারে নয়, ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজনে।

বাংলাদেশে ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি আইন) নামে একটি বেশ কঠোর আইন প্রচলিত হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়েছে। তারপরেও সরকার মনে করছে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার অপরাধ দমন ও সংঘটিত সাইবার অপরাধের বিচার করার উদ্দেশ্যে আরও একটি আইন প্রয়োজন। তাই সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০১৫ নামে আরো একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ‍কিন্তু প্রণীত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহার ও অপ-প্রয়োগ নিয়ে শুরু হয় সমালোচনা।

তারই ফলশ্রুতিতে ২০১৮ সালে পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নামে নতুন এক আইন। যেখানে সমালোচিত ৫৭ ধারা রহিত করা হলেও সেই ৫৭ ধারাকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত করা হয়। সংবাদকর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারা বিলুপ্ত করা হলেও ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারায় হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে সাংবাদিকদের জন্য। তাদের মতে, এ ধারার আওতায় গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে নতুন করে নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হতে পারেন অনেকে। এই আইনের প্রস্তাবের পর থেকেই এত উদ্বেগ, বিতর্ক আর সমালোচনা থাকলেও এ আইন বর্তমানে কার্যকর। বহু মানুষ ইতোমধ্যে এই আইনের মাধ্যমে শাস্তির আওতায় এসেছে।

এই আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে। আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে।

ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতিগোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করলে ওই আইন ভঙ্গ করা হবে। এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতেপারে। তাই এই আইনটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করছে বলে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মানবাধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্টরা।

ফলাফল
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি প্রণীত হয়েছে প্রায় ৪ বৎসর আগে এবং আইনটি বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে আসছে ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতাকে। ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে গৃহীত ৬৬৮টি মামলা পর্যবেক্ষণ করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) জানিয়েছে, এই মামলাগুলোর বেশির ভাগই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের দ্বারা না হয়ে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা তাদের নেতাদের পক্ষ হয়ে করেন। যেসব রাজনৈতিক মামলা তারা খুঁজে পেয়েছে, তার ৮৫ ভাগ করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, যদিও মোট কতগুলো মামলাকে তারা রাজনৈতিক মামলা হিসেবে বিবেচনা করেছেন, সে তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে গবেষকদের মতে, ‘আইনটি ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করছে।’ দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী (২৬ জুন ২০২০) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে মামলা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কটূক্তিমূলক’ পোস্ট দেওয়া, পোস্ট শেয়ার করা, কার্টুন বা ব্যঙ্গাত্মক চিত্র আঁকা, ই-মেইলে যোগাযোগ করা এবং নিজেদের মধ্যে চ্যাট করার দায়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষ ওই বছর গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কমপক্ষে ৩৮ জন সাংবাদিক।

২০২১ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা মে মাসে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা এবং গ্রেপ্তার করা৷ এ ঘটনা দেশ ও দেশের বাইরে আলোড়ন তুলেছিল৷ ছয় দিন পর রোজিনা ইসলাম জামিনে মুক্তি পান ৷ পরে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক সংস্থা ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড সাহসী সাংবাদিকতার জন্য তাকে ‘ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড-২০২১’ দেয়৷ রোজিনাকে হেনস্তা ও গ্রেপ্তার বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়৷ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকের ক্রমাবনতির একটি অবশ্যম্ভাবী ফলাফল এটি৷

কি হতে পারতো
এটা সহজে অনুমেয় যে, এই আইন স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার বিঘ্নিত করছে। এছাড়াও এই আইনের বাস্তবায়নে সরকারের জবাবদিহিতার জায়গাটা দুর্বল হয়েছে। সাহসী সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করছে। এতে সমাজে অন্যায় ও অস্থিরতা বাড়বে। ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে যা বিঘ্নিত করবে গণতান্ত্রিক চর্চাকে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আইনটি সংসদে পাস করার আগে বিস্তারিত আলোচনার দরকার ছিল। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে আইনটি সংসদে পাস করা উচিত ছিল। কোনো আইনের খসড়া প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার রীতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রচলিত আছে। এর মধ্যদিয়ে প্রজাতন্ত্রের যে কোনো আইনে জনসাধারণের মতামত প্রতিফলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ আইনে বাক স্বাধীনতাকে অপরাধে পরিণত করা হয়েছে। ফিরে যাওয়া হয়েছে মধ্যযুগে। যদিও সরকারের পক্ষ হতে বলা হয় এ আইনে কোথাও কোনো ধারায় সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়নি।

পরিশেষে
২০২১ সালের ২০ এপ্রিল ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক প্রতিবেদনে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২ তম, ২০২০ সালে যেটি ছিল ১৫১তম৷ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তার ভিত্তিতে ২০০২ সাল থেকে আরএসএফ এই সূচক প্রকাশ করে আসছে৷ ২০১৩ সাল থেকে এই সূচকে বাংলাদেশ আছে৷ তখন বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৪তম৷ ২০২১ সালের প্রতিবেদনে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবার পেছনে ৷ সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান (১৪৫), ভারত (১৪২), মিয়ানমার (১৪০), শ্রীলঙ্কা (১২৭), আফগানিস্তান (১২২), নেপাল (১০৬), মালদ্বীপ (৭৯), ভুটান (৬৫)৷ এই ধারবাহিক অবনমনের পেছনে গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের অদৃশ্যমান কঠোর নীতি, দমনমূলক আইন বিশেষ করে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার।

সাশ্রয়ীমূল্যে স্বাধীনভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ যেসব দেশে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, মানুষ এই সুবিধা হতে বঞ্চিত সেখানে সামগ্রিক উন্নয়নে মানুষের অংশগ্রহণ কম এবং গণতন্ত্রে গণমানুষের অধিকার সংকুচিত হয়। তাছাড়া ডিজিটাল ডিভাইড মানুষে মানুষে শ্রেণি বৈষম্য বাড়ায়। গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জনগণের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রীয় শান্তি সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা বিধানে নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন আছে মেধাস্বত্ব রক্ষাসহ ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনও। কিন্তু কোনভাবেই তা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত না করে। সর্বোপরি, জাতির পিতার সোনার বাংলা এবং দেশরত্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার এবং এর ব্যবহারিক স্বাধীনতা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ ইন্টারনেট ফ্রিডম ইনিশিয়েটিভ ওয়ার্কিং গ্রুপ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...