তিনি ছিলেন‌ ‌আমাদের‌ আদর্শ ‌শিক্ষাগুরু
প্রয়াত ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিন‌ ‌কস্তা,‌ ‌সিএসসি (ছবি: সংগৃহীত)

ফাদার‌ ‌বিকাশ‌ ‌কুজুর,‌ ‌সিএসসি‌ ‌

শিক্ষাক্ষেত্রেই‌ ‌কাটিয়ে‌ ‌দিয়েছেন‌ ‌সারাটি‌ ‌জীবন।‌ ‌শিক্ষাকেই‌ ‌জীবনের‌ ‌একান্ত‌ ‌অনুষঙ্গ‌ ‌করে‌ ‌জ্বালিয়েছেন‌ ‌শত‌ ‌শত‌ ‌সম্ভাবনার‌ ‌আলো। জাতি,‌ ‌ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে‌ ‌সকলের‌ ‌কাছে‌ ‌তিনি‌ ‌ছিলেন‌ ‌একজন‌ ‌অভিভাবক।‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌কাছে‌ ‌তিনি‌ ‌ছিলেন‌ ‌অত্যন্ত‌ ‌শ্রদ্ধার‌ ‌ও‌ ‌পিতৃতুল্য‌ ‌মানুষ।‌ ‌

মৃত্যুর‌ ‌কিছুদিন‌ ‌পূর্বেও‌ ‌তিনি‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়ের‌ ‌ভারপ্রাপ্ত‌ ‌ভিসি‌ ‌হিসেবে‌ ‌কর্মরত‌ ‌ছিলেন।‌ ‌আজ এই মাহান শিক্ষাগুরুর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

তবে‌ ‌অবসর‌ ‌গ্রহণের‌ ‌মাত্র‌ ‌তিন‌ ‌দিনের‌ ‌মাথায়‌ ‌তিনি‌ ‌হঠাৎ‌ ‌ভীষণ‌ ‌অসুস্থ‌ ‌হয়ে‌ ‌পড়েন।‌ ‌আর‌ ‌এ‌ ‌অসুস্থতা‌ ‌থেকে‌ ‌তিনি‌ ‌আর‌ ‌মুক্তি‌ ‌পাননি।‌ ‌২০১৭ সালের‌ ‌১৩‌ ‌অক্টোবর‌ ‌বিকেল‌ ‌৩‌ ‌ঘটিকায়‌ ‌সকলকে‌ ‌কাঁদিয়ে‌ ‌পাড়ি‌ ‌দিয়েছেন‌ ‌পরপারে।‌ ‌মৃত্যুকালে‌ ‌তার‌ ‌বয়স‌ ‌হয়েছিল‌ ‌৭৬‌ ‌বছর।‌

‌যার‌ ‌কথা‌ ‌বলছি‌ ‌তিনি‌ ‌অন্যতম‌ ‌চিন্তাবিদ,‌ ‌লেখক,‌ ‌শিক্ষাগুরু‌ ‌এবং‌ ‌অভিভাবক‌ ‌ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিন‌ ‌কস্তা,‌ ‌সিএসসি।‌ ‌তিনি‌ ‌২৬‌ ‌সেপ্টেম্বর‌ ‌১৯৪২‌ সালে ‌ঢাকা‌ ‌জেলার‌ ‌কালীগঞ্জ‌ ‌থানাধীন‌ ‌দড়িপাড়া‌ ‌গ্রামে‌ ‌জন্মগ্রহণ‌ ‌করেন।‌ ‌

‌তাঁর‌ ‌বাল্য‌ ‌বয়সেই‌ ‌তার‌ ‌পিতামাতা‌ ‌পাবনা‌ ‌জেলার‌ ‌চাটমোহর‌ ‌থানার‌ ‌রাজারদিয়ার‌ ‌গ্রামে‌ ‌এসে‌ ‌স্থায়ীভাবে‌ ‌বসবাস‌ ‌শুরু‌ ‌করেন।‌ ‌ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিন‌ ‌ছোটবেলা‌ ‌থেকেই‌ ‌খুবই‌ ‌মেধাবী‌ ‌ছিলেন।‌ ‌

তিনি‌ ‌বান্দুরা‌ ‌হলিক্রস‌ ‌হাইস্কুল‌ ‌হতে‌ ‌ম্যাট্রিকুলেশন,‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ‌ ‌হতে‌ ‌এইচএসসি,‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়,‌ ‌ইণ্ডিয়ানা‌ ‌হতে‌ ‌বিএ‌ ‌(দর্শনশাস্ত্র),‌ খ্রিস্টরাজার‌ ‌সেমিনারী,‌ ‌করাচী‌ ‌হতে‌ ‌ধর্মতত্ত্ব,‌ ‌শিকাগো‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়‌ ‌হতে‌ ‌এমএ‌ ‌এবং‌ ‌জর্জটাউন‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়‌ ‌হতে‌ ‌ভাষাতত্ত্বে‌ ‌কোর্স‌ ‌সম্পন্ন‌ ‌করেন।‌ ‌

এরপর‌ ‌তিনি‌ ‌১৯৭৬‌ ‌সালে‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ,‌ ‌ঢাকায়‌ ‌প্রভাষক‌ ‌হিসেবে‌ ‌যোগদান‌ ‌করেন।‌ ‌১৯৯১‌ ‌সালে‌ ‌ভাইস‌ ‌প্রিন্সিপাল‌ ‌এবং‌ ‌১৯৯৮-২০১২‌ ‌সাল‌ ‌পর্যন্ত‌ ‌অধ্যক্ষের‌ ‌দায়িত্ব‌ ‌পালন‌ ‌করেন।‌ ‌ ‌২০১৩-২০১৭ সালের‌ ‌সেপ্টেম্বর‌ ‌মাস‌ ‌পর্যন্ত‌ ‌তিনি‌ ‌নব‌ ‌প্রতিষ্ঠিত‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়‌ ‌বাংলাদেশ‌ ‌এর‌ ‌ভারপ্রাপ্ত‌ ‌ভিসি‌ ‌হিসেবে‌ ‌দায়িত্ব‌ ‌পালন‌ ‌করেন।‌ ‌ ‌

ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিন‌ ‌কর্মজীবনের‌ ‌বেশিরভাগ‌ ‌সময়‌ ‌কাটিয়েছেন‌ ‌শিক্ষাসেবায়।‌ ‌কলেজে‌ ‌তার‌ ‌অফিস‌ ‌কক্ষে‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌কাজে‌ ‌ঘন্টার‌ ‌পর‌ ‌ঘন্টা‌ ‌সময়‌ ‌ব্যয়‌ ‌করতেন,‌ ‌অফিস‌ ‌টাইম‌ ‌তো‌ ‌আছেই।‌ ‌ছিলেন‌ ‌একজন‌ ‌নিবেদিতপ্রাণ‌ ‌মানুষ।‌ ‌তিনি‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌অত্যন্ত‌ স্নেহ‌ ‌করতেন।‌ ‌

ক্যাম্পাসে‌ ‌কোন‌ ‌ছাত্রের‌ ‌সাথে‌ ‌দেখা‌ ‌হলে‌ ‌তিনি‌ ‌সহাস্যে‌ ‌জিজ্ঞেস‌ ‌করতেন,‌ ‌“কেমন‌ ‌আছ?”‌ ‌তার‌ ‌কোমল‌ ‌ব্যবহার‌ ‌ও‌ ‌সাদাসিধে‌ ‌জীবন‌ ‌সকলকে‌ ‌দারুণভাবে‌ ‌নাড়া‌ ‌দিতো।‌ ‌একজন‌ ‌খাঁটি‌ ‌শিক্ষাগুরু‌ ‌হিসেবে‌ ‌তিনি‌ ‌সব‌ ‌সময়‌ ‌চেয়েছেন‌ ‌শিক্ষার্থীরা‌ ‌জ্ঞাণ‌ ‌অর্জন‌ ‌করুক,‌ ‌দেশীয়‌ ‌মূল্যবোধ‌ ‌ও‌ ‌সংস্কৃতিতে‌ ‌বেড়ে‌ ‌উঠুক।‌

‌তিনি‌ ‌নিজ‌ ‌প্রতিষ্ঠান‌ ‌সম্বন্ধে‌ ‌বলতে‌ ‌গিয়ে‌ ‌তার‌ ‌লেখা‌ ‌‘সন্নাসব্রতীর‌ ‌শিক্ষাসেবা’‌ ‌নামক‌ ‌বইটিতে‌ ‌লিখেছেন,‌ ‌“নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ‌ ‌একটি‌ ‌পরিবারের‌ ‌মতো।‌ ‌এখানে‌ ‌যারা‌ ‌বাস‌ ‌করে‌ ‌বা‌ ‌কাজ‌ ‌করে‌ ‌তারা‌ ‌সবাই‌ ‌নিজেকে‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌পরিবারের‌ ‌সদস্য‌ ‌হিসেবে‌ ‌ভাবতেই‌ ‌বেশি‌ ‌পছন্দ‌ ‌করে।‌ ‌

কলেজের‌ ‌প্রশাসন,‌ ‌শিক্ষকমণ্ডলী,‌ ‌ছাত্রবৃন্দ,‌ ‌অফিস‌ ‌স্টাফ‌ ‌এবং‌ ‌অন্যান্য‌ ‌সকল‌ ‌কর্মকর্তা-কর্মচারী‌ ‌নিজেকে‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌পরিবারের‌ ‌সদস্য‌ ‌হিসেবে‌ ‌পরিচয়‌ ‌দিতে‌ ‌গর্ববোধ‌ ‌করে।‌ ‌তার‌ ‌কারণ,‌ ‌এখানে‌ ‌সবার‌ ‌সম্মিল্লিত‌ ‌প্রচেষ্টায়‌ ‌পরস্পরের‌ ‌মধ্যে‌ ‌সম্প্রীতির‌ ‌একটি‌ ‌সুন্দর‌ ‌সম্পর্ক‌ ‌গড়ে‌ ‌উঠেছে‌ ‌এবং‌ ‌সংশ্লিষ্ট‌ ‌সবাই‌ ‌সেই‌ ‌সম্পর্ক‌ ‌সযত্নে‌ ‌লালন‌ ‌করার‌ ‌ব্যাপারে‌ ‌যত্নশীল”।‌ ‌

তিনি‌ ‌তার‌ ‌এ‌ ‌পারিবারিক‌ ‌ও‌ ‌সম্মিলিত‌ ‌প্রচেষ্টার‌ ‌ধারণা‌ ‌ছড়িয়ে‌ ‌দিয়েছিলেন‌ ‌ঢাকা‌ ‌শহরের‌ ‌অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর‌ ‌মধ্যে।‌ ‌তাই‌ ‌তিনি‌ ‌দেশের‌ ‌স্বনামধন্য‌ ‌ও‌ ‌ঐতিহ্যবাহী‌ ‌বেশ‌ ‌কয়েকটি‌ ‌শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে‌ ‌সংগঠিত‌ ‌করে‌ ‌একটি‌ ‌শিক্ষা‌ ‌আন্দোলন‌ ‌গড়ে‌ ‌তুলেছিলেন।‌ ‌সেটির‌ ‌নাম‌ ‌ছিল‌ ‌‘শিক্ষার‌ ‌মানোন্নয়নে‌ ‌সম্মিলিত‌ ‌প্রচেষ্টা’।‌ ‌তিনিই‌ ‌ছিলেন‌ ‌এই‌ ‌পর্ষদের‌ ‌প্রতিষ্ঠাতা‌ ‌সভাপতি।‌ ‌উপদেষ্টা‌ ‌হিসেবে‌ ‌ছিলেন‌ ‌দেশের‌ ‌অনেক‌ ‌গুণীজন।‌ ‌

এ‌ ‌শিক্ষা‌ ‌আন্দোলনটি‌ ‌দারুণ‌ ‌জনপ্রিয়‌ ‌হয়ে‌ ‌উঠেছিল।‌ ‌প্রতি‌ ‌বছর‌ ‌একটি‌ ‌নির্দিষ্ট‌ ‌সময়ে‌ ‌সদস্য‌ ‌প্রতিষ্ঠানের‌ ‌শিক্ষার্থীরা‌ ‌শিক্ষা‌ ‌ও‌ ‌সাংস্কৃতিক‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌প্রতিযোগিতায়‌ ‌অবতীর্ণ‌ ‌হতো।‌ ‌দুই‌ ‌দিনব্যাপি‌ ‌সেই‌ ‌প্রতিযোগিতার‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌বিভাগে‌ ‌(বিতর্ক,‌ ‌নৃত্য,‌ ‌সংগীত,‌ ‌সাধারণ‌ ‌জ্ঞাণ,‌ ‌আইকিউ‌ ‌টেস্ট‌ ‌প্রভৃতি)‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌প্রতিষ্ঠানের‌ ‌শিক্ষার্থীদের‌ ‌মধ্যে‌ ‌জমজমাট‌ ‌লড়াই‌ ‌হতো।‌ ‌

এভাবে‌ ‌শিক্ষার্থীরা‌ ‌কেবল‌ ‌পাঠ্যপুস্তকে‌ ‌সীমাবদ্ধ‌ ‌না‌ ‌থেকে‌ ‌শারীরিক,‌ ‌মানসিক‌ ‌ও‌ ‌বুদ্ধিদীপ্ত‌ ‌জ্ঞাণ‌ ‌চর্চায়‌ ‌অবতীর্ণ‌ ‌হতো।‌ ‌তারা‌ ‌সৃজনশীলতার‌ ‌প্রকাশ‌ ‌ও‌ ‌ ‌প্রতিভা‌ ‌বিকাশের‌ ‌মোক্ষম‌ ‌সুযোগ‌ ‌লাভ‌ ‌করতো।‌ ‌একজন‌ ‌শিক্ষার্থীর‌ ‌শিক্ষাকাল‌ ‌এমন‌ ‌হওয়াই‌ ‌তো‌ ‌বাঞ্চনীয়!‌ ‌

শ্রদ্ধেয়‌ ‌ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিনের‌ ‌কথায়‌ ‌সব‌ ‌সময়‌ ‌ফুটে‌ ‌উঠতো‌ ‌দেশমাতৃকার‌ ‌প্রতি‌ ‌অগাধ‌ ‌ভালবাসা।‌ ‌মহান‌ ‌মুক্তিযুদ্ধে‌ ‌তিনি‌ ‌সরাসরি‌ ‌যুদ্ধে‌ ‌অংশগ্রহণ‌ ‌না‌ ‌করলেও‌ ‌নিজের‌ ‌জীবনের‌ ‌ঝুঁকি‌ ‌নিয়ে‌ ‌কালীগঞ্জের‌ ‌নাগরীতে‌ ‌অবস্থিত‌ ‌সেন্ট‌ ‌নিকোলাস‌ ‌চার্চে‌ ‌ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে‌ ‌সকলকে‌ ‌আশ্রয়‌ ‌দিয়েছিলেন‌ ‌এবং‌ ‌অন্নের‌ ‌সংস্থান‌ ‌করেছিলেন।‌ ‌একজন‌ ‌পিতার‌ ‌মতোই‌ ‌তিনি‌ ‌তাদের‌ ‌আগলে‌ ‌রেখেছিলেন।‌ ‌

কলেজে‌ ‌তিনি‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌সব‌ ‌সময়‌ ‌বলতেন‌ ‌সৎ‌ ‌থাকতে,‌ ‌ছলনা‌ ‌না‌ ‌করতে‌ ‌এবং‌ ‌সারাজীবন‌ ‌ভাল‌ ‌মানুষ‌ ‌হয়ে‌ ‌বাঁচতে।‌ ‌বেশ‌ ‌কয়েক‌ ‌বছর‌ ‌আগের‌ ‌ঘটনা:‌ ‌শিক্ষাবোর্ডগুলোতে‌ ‌‌অ+‌ ‌প্রাপ্তির‌ ‌ভিত্তিতে‌ ‌শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের‌ ‌স্থান‌ ‌নির্ধারণ‌ ‌শুরু‌ ‌হয়েছে।‌ ‌তবে‌ ‌ঐতিহ্যগতভাবেই‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ‌ ‌বরাবরই‌ ‌শ্রেষ্ঠত্ব‌ ‌লাভ‌ ‌করে‌ ‌আসছিল।‌

‌কিন্তু‌ ‌একবার‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজকে‌ ‌টপকে‌ ‌অন্য‌ ‌একটি‌ ‌কলেজ‌ ‌প্রথম‌ ‌স্থান‌ ‌লাভ‌ ‌করে।‌ ‌তখন‌ ‌একটি‌ ‌টেভিভিশন‌ ‌চ্যানেলের‌ ‌একজন‌ ‌সাংবাদিক‌ ‌তাকে‌ ‌প্রশ্ন‌ ‌করেছিলেন,‌ ‌“প্রতিবারের‌ ‌ন্যায়‌ ‌তো‌ ‌এ‌ ‌বছর‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ‌ ‌প্রথম‌ ‌হল‌ ‌না।‌ ‌তাই‌ ‌এ‌ ‌ব্যাপারে‌ ‌আপনার‌ ‌মন্তব্য‌ ‌কি?‌ ‌তিনি‌ ‌অকপটে‌ ‌উত্তর‌ ‌দিয়েছিলেন,‌ ‌“প্রথম‌ ‌হয়ে‌ ‌ছাত্র‌ ‌যদি‌ ‌বাটপার‌ ‌হয়,‌ ‌তবে‌ ‌সেই‌ ‌শিক্ষার‌ ‌কি‌ ‌কোন‌ ‌মূল্য‌ ‌আছে?‌ ‌আমরা‌ ‌প্রথম‌ ‌হওয়ার‌ ‌জন্য‌ ‌কলেজ‌ ‌পরিচালনা‌ ‌করি‌ ‌না,‌ ‌কলেজ‌ ‌পরিচালনা‌ ‌করি‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌মানুষের‌ ‌মতো‌ ‌মানুষ‌ ‌করতে,‌ ‌সঠিক‌ ‌মূল্যবোধে‌ ‌জীবন‌ ‌গড়তে‌ ‌সাহায্য‌ ‌করতে।”‌ ‌শ্রদ্ধেয়‌ ‌ফাদারের‌ ‌সেই‌ ‌কথাটি‌ ‌আজও‌ ‌কর্ণ‌ ‌কুহরে‌ ‌বেজে‌ ‌চলছে!‌ ‌

তিনি‌ ‌শিক্ষক-ছাত্র‌ ‌থেকে‌ ‌শুরু‌ ‌করে‌ ‌নানা‌ ‌বয়সী‌ ‌ও‌ ‌ধর্মের‌ ‌লোকদের‌ ‌অনেক‌ ‌পরামর্শ‌ ‌দিতেন।‌ ‌কাউন্সিলিংয়ের‌ ‌উপর‌ ‌তার‌ ‌কোন‌ ‌প্রফেশনাল‌ ‌ডিগ্রি‌ ‌ছিল‌ ‌না‌ ‌বটে,‌ ‌কিন্তু‌ ‌অনেকেই‌ ‌তার‌ ‌কাছে‌ ‌আসতেন‌ ‌নানা‌ ‌সমস্যায়‌ ‌পরামর্শ‌ ‌নিতে।‌ ‌

কলেজের‌ ‌প্রভাষক‌ ‌ও‌ ‌প্রফেসরগণ‌ ‌ক্লাশে‌ ‌আমাদের‌ ‌প্রায়ই‌ ‌বলতেন,‌ ‌“ফাদারের‌ ‌কাছে‌ ‌গেলে‌ ‌শ্রদ্ধায়‌ ‌মাথা‌ ‌নত‌ ‌হয়ে‌ ‌আসে।‌ ‌কী‌ ‌জানেন‌ ‌না‌ ‌তিনি?‌ ‌সব‌ ‌বিষয়েই‌ ‌তার‌ ‌দখল‌ ‌দেখলে‌ ‌অবাক‌ ‌হতে‌ ‌হয়।‌ ‌তার‌ ‌এতো‌ ‌জ্ঞান,‌ ‌অথচ‌ ‌কী‌ ‌বিনম্র‌ ‌একটা‌ ‌মানুষ!”‌ ‌বাস্তুবিক‌ ‌আমাদের‌ ‌শিক্ষকগণও‌ ‌নিজেদের‌ ‌ব্যক্তিগত‌ ‌বা‌ ‌প্রতিষ্ঠানের‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌বিষয়ে‌ ‌পরামর্শ‌ ‌করতে‌ ‌যেতেন।‌ ‌তিনি‌ ‌ছিলেন‌ ‌সকলের‌ ‌অভিভাবক।‌ ‌ ‌

১৩‌ ‌অক্টোবর‌ ‌বিকেল‌ ‌৩‌ ‌ঘটিকায়‌ তিনি মারা যান। ১৪‌ ‌অক্টোবর‌ ‌ফাদারের‌ ‌মরদেহ‌ ‌রমনা‌ ‌চার্চে‌ ‌(গির্জায়)‌ ‌নেওয়া‌ ‌হলো।‌ ‌সেদিন‌ ‌হঠাৎ‌ ‌সমস্ত‌ ‌নীরবতা‌ ‌ভেঙে‌ ‌“আব্বা,‌ ‌আমার‌ ‌আব্বা”‌ ‌বলে‌ ‌হাউ‌ ‌মাউ‌ ‌করে‌ ‌কেঁদে‌ ‌উঠলো‌ ‌কেউ।‌ ‌দেখি‌ ‌মলিন‌ ‌পোশাক‌ ‌পরা‌ ‌এক‌ ‌জীর্ণ-শীর্ণ‌ ‌চল্লিশোর্ধ‌ ‌মহিলা‌ ‌সমস্ত‌ ‌প্রটোকল‌ ‌ভেঙে‌ ‌আছড়ে‌ ‌পড়ল‌ ‌ফাদারের‌ ‌মরদেহের‌ ‌উপর।‌ ‌কোনভাবেই‌ ‌তাকে‌ ‌সরানো‌ ‌যাচ্ছিল‌ ‌না।‌ ‌তিনি‌ ‌বার‌ ‌বার‌ ‌মূর্ছা‌ ‌যাচ্ছিলেন।‌ ‌

পরে‌ ‌জানা‌ ‌গেল‌ ‌তিনি‌ ‌মতিঝিলের‌ ‌বস্তিতে‌ ‌থাকেন।‌ ‌শ্রদ্ধেয়‌ ‌ফাদার‌ ‌এতো‌ ‌উচ্চ‌ ‌পর্যায়ের‌ ‌মানুষ‌ ‌হয়েও‌ ‌সাধারণ‌ ‌মানুষদের‌ ‌এতোটা‌ ‌কাছে‌ ‌এসেছিলেন!‌ ‌

ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিন‌ ‌বহু‌ ‌প্রতিষ্ঠানের‌ ‌উপদেষ্টা‌ ‌পরিষদের‌ ‌সদস্য‌ ‌ছিলেন।‌ ‌শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ‌ ‌সমাজকল্যাণমূলক‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌প্রতিষ্ঠান‌ ‌তাদের‌ ‌পলিসি‌ ‌নির্ধারণ‌ ‌কিংবা‌ ‌প্রতিষ্ঠান‌ ‌সংক্রান্ত‌ ‌যে‌ ‌কোন‌ ‌পরামর্শের‌ ‌জন্য‌ ‌তার‌ ‌কাছে‌ ‌আসতেন।‌ ‌আবার‌ ‌কোন‌ ‌প্রতিষ্ঠান‌ ‌কোন‌ ‌প্রকার‌ ‌আইনী‌ ‌বা‌ ‌নীতিমালগত‌ ‌ঝামেলায়‌ ‌পড়লে‌ ‌তাঁর‌ ‌শরণাপন্ন‌ ‌হতেন।‌

‌এতে‌ ‌অনেক‌ ‌সময়‌ ‌তিনি‌ ‌নিজেই‌ ‌নিজের‌ ‌সমস্ত‌ ‌কাজ‌ ‌ফেলে‌ ‌সাহাযার্থীকে‌ ‌সাথে‌ ‌নিয়ে‌ ‌চলে‌ ‌যেতেন‌ ‌শিক্ষামন্ত্রণালয়ে।‌ ‌এভাবে‌ ‌মাননীয়‌ ‌শিক্ষামন্ত্রীর‌ ‌সাথে‌ ‌তার‌ ‌বেশ‌ ‌হৃদ্যতা‌ ‌তৈরি‌ ‌হয়ে‌ ‌গিয়েছিল।‌ ‌তাই‌ ‌ফাদারের‌ ‌শেষকৃত্য‌ ‌অনুষ্ঠানে‌ ‌তিনি‌ ‌তাকে‌ ‌শেষবার‌ ‌বিদায়‌ ‌জানাতে‌ ‌ছুটে‌ ‌এসেছিলেন‌ ‌রমনা‌ ‌চার্চে।‌ ‌

সরকারী‌ ‌ও‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌আন্তর্জাতিক‌ ‌পরিমণ্ডলের‌ ‌অনেক‌ ‌উচ্চ‌ ‌পর্যায়ের‌ ‌বহু‌ ‌ব্যক্তির‌ ‌সাথেও‌ ‌ফাদারের‌ ‌ব্যক্তিগত‌ ‌পরিচয়‌ ‌ছিল।‌ ‌শিক্ষকতার‌ ‌দীর্ঘ‌ ‌জীবনে‌ ‌তিনি‌ ‌বহু‌ ‌সংখ্যক‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌ব্যক্তিগতভবে‌ ‌চিনতেন।‌ ‌এদের‌ ‌অনেকেই‌ ‌এখন‌ ‌দেশের‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌গুরুত্বপূর্ণ‌ ‌সেক্টরে‌ ‌এবং‌ ‌দেশের‌ ‌বাইরে‌ ‌অনেক‌ ‌উচ্চপদে‌ ‌কর্মরত‌ ‌আছেন।‌ ‌

কলেজ‌ ‌ক্যাম্পাস‌ ‌ছেড়ে‌ ‌যাওয়ার‌ ‌পরও‌ ‌স্মৃতিকাতর‌ ‌হয়ে‌ ‌এবং‌ ‌পির্ততুল্য‌ ‌ফাদার‌ ‌বেঞ্জামিনের‌ ‌সাথে‌ ‌সৌজন্য‌ ‌সাক্ষাত‌ ‌লাভের‌ ‌জন্য‌ ‌অনেকেই‌ ‌তার‌ ‌কাছে‌ ‌ছুটে‌ ‌আসতেন।‌ ‌তারা‌ ‌ফাদারে‌ ‌সাথে‌ ‌কথা‌ ‌বলতেন,‌ ‌নানা‌ ‌পরামর্শ‌ ‌গ্রহণ‌ ‌করতেন‌ ‌এবং‌ ‌ব্যক্তিগত‌ ‌আনন্দ-বেদনা‌ ‌সহভাগিতা‌ ‌‌করতেন।‌ ‌

অন্যদিকে,‌ ‌বিভিন্ন‌ ‌ইলেক্ট্রনিক‌ ‌ও‌ ‌প্রিন্ট‌ ‌মিডিয়ায়‌ ‌তার‌ ‌পদচারণাও‌ ‌তাকে‌ ‌সকলের‌ ‌কাছে‌ ‌সুপরিচিত‌ ‌করে‌ ‌তুলেছিল।‌ ‌তিনি‌ ‌কোন‌ ‌রাজনৈতিক‌ ‌দল‌ ‌বা‌ ‌সরকারী‌ ‌কোন‌ ‌প্রতিষ্ঠানের‌ ‌একজন‌ ‌না‌ ‌হলেও‌ ‌দেশের‌ ‌মানুষের‌ ‌মাঝে‌ ‌যে‌ ‌এতোটা‌ ‌পরিচিত‌ ‌ছিলেন‌ ‌তা‌ ‌বিস্ময়কর‌ ‌বটে!‌ ‌

শিক্ষাদানের‌ ‌ব্যাপার‌ ‌তার‌ ‌কোন‌ ‌কম্প্রমাইজ‌ ‌ছিল‌ ‌না।‌ ‌তিনি‌ ‌নিজে‌ ‌প্রচুর‌ ‌বই‌ ‌পড়তেন‌ ‌এবং‌ ‌লিখতেন।‌ ‌তার‌ ‌লেখা‌ ‌কয়েকটি‌ ‌বই‌ ‌ইতোমধ্যেই‌ ‌প্রকাশ‌ ‌পেয়েছে।‌ ‌বাংলা‌ ‌ও‌ ‌ইংরেজি‌ ‌উভয়‌ ‌ভাষাতেই‌ ‌তার‌ ‌দখল‌ ‌ছিল‌ ‌অবিশ্বাস্য!‌ ‌খ্রিস্টিয়‌ ‌অনুবাদ‌ ‌সাহিত্যে‌ ‌তার‌ ‌নাম‌ ‌প্রথমেই‌ ‌চলে‌ ‌আসে।‌

‌অন্যদিকে,‌ ‌কখনও‌ ‌তাকে‌ ‌কোন‌ ‌সেমিনার‌ ‌বা‌ ‌কনফারেন্সে‌ ‌টক‌ ‌দিতে‌ ‌অনুরোধ‌ ‌করা‌ ‌হলে‌ ‌তিনি‌ ‌ক্যালেণ্ডার‌ ‌চেক‌ ‌করতেন।‌ ‌ঐ‌ ‌দিন‌ ‌কোন‌ ‌ব্যস্ততা‌ ‌না‌ ‌থাকলে‌ ‌তিনি‌ ‌সাথে‌ ‌সাথে‌ ‌সম্মতি‌ ‌দিতেন।‌ ‌ছাত্রদের‌ ‌সাথে‌ ‌সময়‌ ‌কাটাতে,‌ ‌তাদের‌ ‌শেখাতেই‌ ‌ছিল‌ ‌তার‌ ‌অপরিসীম‌ ‌আনন্দ।‌ ‌সেপ্টেম্বর‌ ‌মাসের‌ ‌শেষ‌ ‌সপ্তাহে‌ ‌তিনি‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌বিশ্ববিদ্যালয়‌ ‌হতে‌ ‌অবসর‌ ‌গ্রহণ‌ ‌করার‌ ‌পর‌ ‌পরই‌ ‌অসুস্থ‌ ‌হয়ে‌ ‌পড়েন।‌

‌কিন্তু‌ ‌এর‌ ‌এক‌ ‌সপ্তাহ‌ ‌পরেই‌ ‌বনানীতে‌ ‌অবস্থিত‌ ‌হলি‌ ‌স্পিরিট‌ ‌মেজর‌ ‌সেমিনারীতে‌ ‌একটি‌ ‌টক‌ ‌দেওয়ার‌ ‌কথা‌ ‌ছিল।‌ ‌কিন্তু‌ ‌তিনি‌ ‌হাসপাতালে‌ ‌ভর্তি।‌ ‌তবুও‌ ‌তিনি‌ ‌বললেন‌ ‌যে‌ ‌তিনি‌ ‌যাবেন।‌ ‌তার‌ ‌দৃঢ়‌ ‌বিশ্বাস‌ ‌ছিল‌ ‌যে,‌ ‌তিনি‌ ‌সুস্থ‌ ‌হবেন‌ ‌এবং‌ ‌শিক্ষীর্থীদের‌ ‌আলোকিত‌ ‌করবেন‌ ‌…‌ ‌কিন্তু সে আশা আর পূরণ‌ ‌হল‌ ‌না।‌ ‌মৃত্যু‌ ‌তাঁকে‌ ‌সকলের‌ ‌কাছ‌ ‌থেকে‌ ‌বহুদূরে‌ ‌নিয়ে‌ ‌চলে‌ ‌গেল।‌ ‌

তাকে‌ ‌হারিয়ে‌ ‌আমরা‌ ‌ব্যথিত,‌ ‌শোকান্বিত;‌ ‌তাকে‌ ‌হারানো‌ ‌আমাদের‌ ‌জন্য‌ ‌অপূরণীয়‌ ‌ক্ষতি।‌ ‌যে‌ ‌আদর্শ,‌ ‌যে‌ ‌পিতৃত্ব,‌ ‌দেশ-মাতৃকার‌ ‌প্রতি‌ ‌যে‌ ‌ভালোবাসা‌ ‌তিনি‌ ‌দেখিয়েছে‌ ‌ও‌ ‌শিখিয়েছেন,‌ ‌তা‌ ‌এখন‌ ‌পালন‌ ‌করার‌ ‌দায়িত্ব‌ ‌আমাদের।‌ ‌“যে‌ ‌দীপ জ্বালিবার‌ ‌জন্য‌ ‌হইয়াছে,‌ ‌তাহার‌ ‌তেল‌ ‌অল্প‌ ‌হয়‌ ‌না;‌ ‌রাত্রিভর জ্বলিয়া,‌ ‌তবেই‌ ‌তাহার‌ ‌নির্বাণ”।‌ ‌

লেখক:‌ ‌প্রাক্তন‌ ‌ছাত্র,‌ ‌নটর‌ ‌ডেম‌ ‌কলেজ‌ এবং ধর্ম যাজক, সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারস্ চার্চ, ফৈলজানা, চাটমোহর, পাবনা। ‌

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...