দিনাজপুর মহারাজাা স্কুল ট্রাজেডি ১৯৭২
লেখক সুরাইয়া শারমিন

সুরাইয়া শারমিন

দিনাজপুর আমার শ্বশুর বাড়ি। আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা দিনাজপুর। দিনাজপুর গেলেই আমি ঘুরে বেড়াই এখানে ওখানে, কারণ পুরা দিনাজপুরেই আছে দেখার মতো অনেক কিছু। তার মধ্যে দিনাজপুর মহারাজার বাড়ি আমার খুব পছন্দের একটা জায়গা।

আমি দিনাজপুর আসলে প্রতিবারই মহারাজার বাড়ি যাই আর মহারাজার বাড়ি যাওয়ার পথে পরে মহারাজা স্কুল। আর এই স্কুলে ঘটে যাওয়া এক করুণ কাহিনী আমাকে সব সময় কাঁদায় আজ সেই ঘটনা লেখছি।

দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় দিনাজপুর। দেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালে মুক্তি যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শক্ত ঘাটি ছিলো পুরো উওর বঙ্গে এবং যুদ্ধে প্রথম পর্যায়ে কিন্তু দিনাজপুরের সাধারণ জনতা কঠিন প্রতিরোধ করেছিলো হায়নাদের। তাই তাদের কঠিন ক্ষোভ ছিল তাঁরা দিনাজপুর শহরে তাণ্ডব চালায়।

>> এই লেখকের আরো গল্প পড়ুন : নবিতুন ও শহরের চারটি ছেলে

আর তখন দিনাজপুর শহর প্রায় খালি প্রায় সবাই ইন্ডিয়া চলে যায়, এর মধ্যে আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজনও প্রাণের ভয়ে তাদের বিশাল জমিদার বাড়ি শহরের বাড়ি ফেলে চলে যায় সেই গল্প লেখবো অন্য কোন সময়।

আজ লেখবো আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার এক ট্রেজেডির কথা। যেদিন একসাথে মাইন বিস্ফোরণে মারা গিয়েছিলো ৫০০ থেকে ৬০০ মুক্তিযোদ্ধা। এত বেশি মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের সময়েও একসাথে মৃত্যুবরণ করে নাই।

পাকিস্তানি হানাদারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র, গোলা বারুদ আর মাইন এগুলো তো উদ্ধার করতে হবে তা না হলে ঘটবে দুর্ঘটনার আর সেই কাজ তো এখনই শুরু করতে হবে। সেই কাজ করার দায়িত্বও নিলো মুক্তিযোদ্ধারা। তখন দিনাজপুর মহারাজা গিরিজা নাথ স্কুলে তৈরি হলো মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প।

>> এই লেখকের আরো গল্প পড়ুন : সম বণ্টন

তাঁরা কেউ কেউ একদিন দুইদিনের ছুটি নিয়ে শুধুমাত্র পরিবারের সাথে দেখা করে এসেছে যে, সে বীর মুক্তিযোদ্ধা সে দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসেছে। আবার কেউ হয়তো ভেবেছিলো সব কাজ শেষ করে তারপর একবারে বাড়িতে যাবে দেখা করতে। কিন্তু তাঁরা কেউ আর স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে নাই। তাঁরা হয়ে গিয়েছিলো মাংসের স্তুপ।

এক হৃদয় বিদারক ঘটনা
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের কথা ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন এলাকায় পাকবাহিনীর পুঁতে রাখা মাইন, লুকিয়ে রাখা ও ফেলে যাওয়া অস্ত্র বোমা ও গোলাবারুদ খুঁজে বের করার কাজ শুরু করে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। উদ্ধার করা অস্ত্র মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থিত ট্রানজিট ক্যাম্পে জড়ো করতে থাকেন।

আর সেই ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছিলো ৬ ও ৭ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা। যার মধ্যে ছিলো ভারতের পতিরাম, হামজাপুর, বাঙালবাড়ি, তরঙ্গপুর, বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ, ঘোড়া ঘাট, ফুলবাড়ি, হাকিমপুর, দিনাজপুর সদর, ঠাকুরগাঁও,পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল এই সব এলাকার প্রায় হাজারের ওপরে মুক্তি যোদ্ধা।

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল ঘড়ির কাটায় ৪টা হবে এমন সময় নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট থেকে উদ্ধার করা দুই ট্রাক অস্ত্র নিয়ে আসে মুক্তি যোদ্ধারা মহারাজা স্কুলে।

>> এই লেখকের আরো গল্প পড়ুন : সুমন ভাই

একটি ট্রাকের অস্ত্র খালাসের পর, অপর ট্রাকটির অস্ত্র খালাসের এক পর্যায়ে হাত থেকে একটি মাইন মাটিতে পড়ে যায়। ঐ সময়ে বাংকারে রাখা স্তুপীকৃত বিপুল পরিমাণ মাইন, বোমা বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এবং মহারাজা স্কুলে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা নিহিত হন। সেই সময় নামাজের সময় হওয়াতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা নামাজ পড়া অবস্থায় ছিলো পাশের মসজিদে। তারা নামাজ আদাকৃত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

বাংকার সংলগ্ন এলাকা ২০ থেকে ২৫ ফুট গর্ত হয়ে পুকুরে পরিণত হয়। যা এখনও কালের সাক্ষী হয়ে আছে। সদ্য তৈরি হওয়া পুকুরে পাতাল থেকে উঠা পানি লাল ছিলো কারণ সেই পানিতে মিশে ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ছিন্নভিন্ন লাশের রক্ত। নিহতদের অনেকের মরদেহ ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে যায়। তাই সেদিন অনেক মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় চিহ্নিত করা সম্ভব হয় নাই।

পরেরদিন ৯৬ জন মুক্তি যোদ্ধার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানে। বিপুলসংখ্যাক মানুষ চোখের জলে ভেসে জানাজায় অংশ গ্রহণ করেন। আর তাদের পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয় দিনাজপুর চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গনে।পরে একই স্থানে আরো ৩৯ জনসহ মোট ১৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয় এই মাজারে। এছাড়াও অনেক মুক্তি যোদ্ধার দেহ আত্মীয় স্বজন নিয়ে যান।

ঘটনার পরের দিন আরো অনেক মরদেহ ছিন্ন-বিছন্ন হওয়া হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়। যার আনুমানিক ওজন হয় প্রায় পঞ্চাশ মনের মতো, আর এই কারণে নিহিতের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা যায় নাই। এখনও এই করুণ হৃদয় বিদারক ঘটনার কথা মনে করলে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না।

দিনাজপুর মহারাজা স্কুলের সামনে দিয়ে আমি যতবার গিয়েছি আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আর মনে হয়, আহারে! আমরা যাদের জীবনের বিনিময়ে এ দেশ পেয়েছি, আমরা কি তাদের যোগ্য সন্মান দিতে পেরেছি?

লেখক : গল্পকার, লেখক ও উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...