বাংলা সনের ইতিহাস

বাংলা সন যখন থেকে শুরু বলে ধরে নেওয়া হয়- তারও বহুকাল পূর্ব থেকে এদেশে বিভিন্ন ধরণের সন প্রচলিত ছিলো। এর মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিলো শকাব্দ। শকরাজা শালিবাহন ৭৮ খ্রিস্টাব্দে এই শকাব্দ সন চালু করেছিলেন। তবে এমনও কথিত আছে যে, তারও পূর্বে রাজা বিক্রমাদিত্য ৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংবৎ নামে একটা সন চালু করেছিলেন। এছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় বছর গণনায় বিভিন্ন উপায় প্রচলিত ছিলো।

বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের উৎপত্তি নিয়ে এ যাবৎ বহু তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তবে এই বিষয়ে পন্ডিতগণ নানাভাবে গবেষণা করে স্থায়ী সমাপ্তি টানার চেষ্টা করেছেন। সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বঙ্গে বঙ্গাব্দ শুরু করেছেন বলে কেউ কেউ মত প্রকাশ করলেও অনেকে আবার এর বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তারা জোড়ালো যুক্তি দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে, মোগল সম্রাট আকবরই হলেন বাংলা সনের নির্মাতা।

তবে সম্রাট আকবর বাংলা সন চালু করার আগে ‘এলাহী’ সন নামে আরও একটি সন চালু করেছিলেন। বিখ্যাত ‘আকবর নামায়’ বর্ণিত আছে যে, ৯৬৩ হিজরি সনের ২ রবিয়াসসানি শুক্রবার (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি) সম্রাট আকবর মসনদে আরোহণ করেন। মোগল সাম্রাজ্যের মসনদে বসার ২৫দিন পর ৬ষ্ঠ বিংশতি দিবসে ২৮ রবিয়াসসানি হতে এলাহী সনের গণনা শুরু হয়। অন্যদিকে বাংলা সনের গণনা শুরু হয় একই হিজরি সনের অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল থেকে।

পহেলা বৈশাখ, বাংলা সন যা এক সময় পরিচিত ছিলো কৃষকদের বছর হিসেবে- আজ তা পরিণত হয়েছে একটা জাতীয় উৎসবে। বাঙালি জাতির এখন সবচেয় বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। এই উৎসবে গ্রামের কৃষক থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিতদের অনুভূতি এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়।

সূর্য ও চন্দ্রের উপর নির্ভর করে বিশ্বে দুই ধরণের সন/বছর হিসাব গড়ে উঠেছে। একটি হলো সৌর বছর আর অন্যটি হলো চান্দ্র বছর। সৌর বছর হলো মোট ৩৬৫দিন ৫ঘন্টা ৪৮মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। আর চান্দ্র বছর হলো মোট ৩৫৩দিন ৮ঘন্টা ৪৮মিনিট ৩৪ সেকেন্ড। এতে করে দেখা যায়, চান্দ্র বছর এক সৌর বছরে, সৌর বছর থেকে ১০/১১দিন আগে শেষ হয়ে যায়। সেই হিসাব অনুসারে সৌর বছর চান্দ্র বছর থেকে প্রতি এক বছরে ১০/১১দিন বড়। এইভাবে চান্দ্র বছর প্রতি ৩৩ বছরে সৌর বছর থেকে ১বছর এগিয়ে যায়। এইভাবে ৯৬৩ হিজরি সন থেকে শুরু করে ৩৩ বছর পর পর হিজরি সন মোট ১৩টি এগিয়ে গেছে।

এই গণনা থেকে একটা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, চান্দ্র বছর-হিজরি সন থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হলেও বাংলা সন পরবর্তীকালে চান্দ্র বছরে না থেকে সৌর বছরে রূপান্তরিত হয়ে যায়। সম্রাট আকবর হিজরি ৯৬৩ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু করলেও আমরা বলি বাংলা সনের উৎপত্তি হিজরি ৯৯২ অর্থাৎ ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। তার কারণ হলো, বাংলা সন হলো কৃষকদের সন। কৃষকরা এই সনের বিভিন্ন মাসকে ধরে নিয়ে বীজ বুনতো এবং ফসল কাটতো। সেই জন্য এটাকে ফসলী বছরও বলা হতো।

যেহেতু শুরুতে বাংলা সন গণনা করা হতো চান্দ্র বছর ধরে, তাই সম্রাট আকবর দেখলেন, খাজনা দিতে গিয়ে মাস ঠিক থাকলেও প্রতি বছর কৃষকরা বেশ কিছুদিন পিছিয়ে পড়ছেন। সম্রাট দেখলেন, চান্দ্র বছরের মাস প্রতি বছর এগিয়ে গেলেও কৃষকদের ফসল তোলার সময়টা এগুচ্ছে না। ফলে আকবরের সভাতেই এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এই বিতর্কের সমাধান করার জন্য সম্রাট আকবর দায়িত্ব দেন সভাসদ বিজ্ঞ ব্যক্তি ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে। তিনিই হিজরি ৯৯২ সন ধরে (১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ) বাংলা সনকে চান্দ্র বছর থেকে সৌর বছরে উন্নীত করে এই সমস্যার সমাধান করেন।

বাংলা মাসের নামের উৎপত্তি সম্পর্কে বলার আগে বলতে চাই যে, এটাও প্রমাণিত যে, এক সময় বাংলা সনের প্রথম মাস ছিলো অগ্রহায়ণ। অর্থাৎ-অগ্র হলো আগে বা আগা আর হায়ণ হলো বছর। এই অগ্রহায়ণ মাসেই কৃষকরা ফসল ঘরে তুলতেন বলে এটা ছিলো বাংলা সনের আদি মাস।

বাংলা সনের ১২টি মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্রের নাম থেকে। যেমন, বিশাখা থেকে বৈশাখ। জ্যেষ্ঠ থেকে জ্যৈষ্ঠ। পূর্বাষাঢ়া থেকে আষাঢ়। শ্রাবণা থেকে শ্রাবণ। ভ্রাদ্রপদ থেকে ভাদ্র। অশ্বিনী থেকে আশ্বিন। কৃত্তিকা থেকে কার্তিক। মৃগশিরা/মার্গশীষ থেকে অগ্রহায়ণ। পুষ্যা থেকে পৌষ। মঘা থেকে মাঘ। পূর্ব ফালগুনী থেকে ফাল্গুন এবং সবশেষে চিত্রা থেকে চৈত্র। অন্যদিকে মাসের মোটদিন নির্ধারিত আছে এইভাবে বৈশাখ থেকে ভাদ্র, এই মোট ৫ মাসের দিন হবে ৩১x৫=১৫৫ দিন। আর আশ্বিন থেকে চৈত্র পযর্ন্ত এই ৭ মাসের মোট দিন হবে ৩০x৭=২১০ দিন। এতে করে ১৫৫+২১০=৩৬৫ দিন অর্থাৎ এক বছর।

পহেলা বৈশাখ, বাংলা সন যা এক সময় পরিচিত ছিলো কৃষকদের বছর হিসেবে-আজ তা পরিণত হয়েছে একটা জাতীয় উৎসবে। বাঙালি জাতির এখন সবচেয় বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। এই উৎসবে গ্রামের কৃষক থেকে শুরু করে শহরের শিক্ষিতদের অনুভূতি এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। পহেলা বৈশাখ, এই মিশে যাওয়ার চেতনা যুগ যুগান্ত ধরে জাতির অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক। পাঠকদের জানাই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।

লেখক : ফাদার সুনীল ডানিয়েল রোজারিও, বাংলাদেশ রেডিও ভেরিতাস এশিয়া, বাণীদীপ্তি কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও প্রযোজক এবং রাজশাহীস্থ রেডিও জ্যোতি’র (অনলাইন রেডিও) প্রতিষ্ঠাতা, রাজশাহী সিটি, বাংলাদেশ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...