যে কৌশলে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকিয়েরছ চীন

বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক করোনাভাইরাস প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে চীনে। অর্থনৈতিকভাবে পরাক্রমশালী এ দেশটির হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম ছড়ায় করোনা। শুধু ওই শহরেই এই এক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরেছে হাজার হাজার মানুষ। গতিপ্রকৃতি ও ধরণ বুঝতে বুঝতেই উহানে মহামারী আকার ধারণ করে করোনা। চীন যখন বুঝতে পারলো কিভাবে ছড়াচ্ছে ভাইরাসটি তখন বেশ আটঘাট বেধে নামে এর বিরুদ্ধে। সামগ্রীকভাবে দেশটি যেভাবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা করেছে তা ইতোমধ্যেই সবার নজর কেড়েছে। কয়েকমাসের ব্যবধানেই দেশটি করোনাভাইরাস সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বিষ্ময়করভাবে কমিয়ে এনেছে। এ জন্য চীন ও দেশটির জনগণ যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা করোনা সংক্রমিত অন্যান্য দেশের জন্য অনুকরণীয়। মূলত চীন সরকারের কঠোর মনোভাব, প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ সর্বোপরি দেশটির সচেতন নাগরিকরা মিলেমিশে ঠেকিয়েছে করোনাভাইরাসের বিস্তার।

মাত্র সাত দিনে আক্রান্তের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। দৈনিক আক্রাস্তের সংখ্যা হাজার থেকে শ’য়ের ঘরে নেমে আসে…

শুরুর দিকে যখন উহানে মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে লাগল তখন থেকেই চীন এর বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে লড়াই শুরু করে। ফলশ্রুতিতে সেখানে করোনায় আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। যেখানে সপ্তাহখানেক আগেও চীনে প্রতিদিন হাজারেরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল; সেখানে এখন দৈনিক নতুন রোগীর সংখ্যা একশো’রও নিচে। দেশটিতে একদিনেই সবচেয়ে বেশি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে গত ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই একদিনেই সেখানে ১৪ হাজার ১০৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো- মাত্র ৭ দিনের ব্যবধানে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাড়ায় ৩৯১ জনে।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মূল যুদ্ধটা চালায় চীনের সাধারণ জনগণ। তারা রোগের ভয়াবহতা দ্রুত উপলব্ধি করতে পারায় যে যার মতো সচেতন হয়ে গিয়েছিল। মূলত এই সচেতনতায় করোনার বিস্তার ঠেকাতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। তবে শুধু জনগণ সচেতন হলেই তো আর হবে না, সরকারকেও পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে শি-জিনপিং সরকার যা করেছে তা আসলেই প্রশংসার দাবিদার। ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকাতে কমসময়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল তারা। কঠোর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, উহান ও এর আশপাশের শহরসমূহ একমাসের জন্য লকডাউন করে ফেলা এবং নাগরিকদের সার্বক্ষণিক কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। জাতীয়স্বার্থে গৃহীত এসব ব্যবস্থা মেনে চলায় উৎসাহিত করতে শাস্তি ও পুরস্কারের ব্যবস্থাও করে সরকার।

তড়িৎ ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ

সরকারের ছিল কঠোর মনোভাব

সচেতন ছিল নাগরিকরা

সরকার উহানে তিন বিজ্ঞানীকে পাঠায় সরেজমিন তদন্তে। অণুজীব বিজ্ঞানী ইয়েন কোয়াক-ইয়েন, সার্স গবেষক ঝং ন্যানশান এবং চীনের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোলের প্রধান জর্জ গাও সেখানে যেয়ে সব দেখেশুনে বুঝতে পারেন- অবস্থা বেগতিক। শহর ছাড়িয়ে আশপাশের শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস। তারা তাৎক্ষণিকভাবে উহান ও এর আশপাশের শহর অবরুদ্ধ করে অন্যান্য এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার পরামর্শ দেন। সে মোতাবেক সরকার পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে উহান ও এর আশপাশের শহরগুলো। তাৎক্ষণিকভাবে এই পদক্ষেপ পুরো চীনে করোনার বিস্তার ঠেকানোর প্রথম পদক্ষেপ ছিল। দ্বিতীয় পদক্ষেপ ছিল করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আহেওয়ার ঝুঁকি আছে এমন বক্তিদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের কঠোরতা।

অন্যদিকে করোনায় মৃত্যু ঠেকাতে চীনা চিকিৎসকদের জীবন-মরণ লড়াইও মৃত্যুহার কমিয়েছে। চিকিৎসকরা তো রীতিমতো রোবট হয়ে উঠেছিলেন। এ ছাড়া শহরটির বাসিন্দারাও আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হয়ে লড়াই চালিয়ে গেছে। লুনার নিউ ইয়ারে তারা হাজারে হাজারে মাস্কও বিতরণ করেছে। চিকিৎসকদের পরিবার-সন্তানদের প্রতি প্রতিবেশীরা যেভাবে এগিয়ে এসেছিলেন তাও ছিল মানবতার উজ্জ্বল উদাহরণ। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ হওয়ায় চীনা সরকার করোনার সঙ্গে লড়াইয়ে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গুজব ঠেকিয়ে উল্টো মানুষকে সচেতন করেছে করোনার বিরুদ্ধে। সর্বাধুনিক রোবট-ড্রোন-স্ক্যানারসহ নানান প্রযুক্তি নিয়েই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলিয়ে যাচ্ছে সরকার। এমনকি মোবাইল অ্যাপলিকেশনকেও করোনা বিস্তার ঠেকাতে ব্যবহার করা হয়েছে।

এর আগেও হুট করে ছড়িয়ে পড়া ‘সার্স’ মোকাবেলায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে চীন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (হু) করোনার বিস্তার ঠেকাতে চীনের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। এক প্রতিবেদনে হু জানায়, চীনের ‘সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি’ দ্রুত বর্ধনশীল ও মারাত্মক মহামারীতে রূপ নেওয়া করোনার পথ পরিবর্তন করেছে। আগেও অজানা ভাইরাস মোকাবেলায় (যেমন-সার্স) চীনের গৌরবান্বিত ইতিহাস রয়েছে উল্লেখ করে হু আরও জানায়, দেশটি চতুরতার সঙ্গে আক্রমণাত্মক এসব রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, করোনার বিস্তার ঠেকাতে চীনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে কড়াকাড়িভাবে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনার বাস্তবায়ন করা। উহান কর্তৃপক্ষ জেলা স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে রূপান্তর করে। এমনকি কম গুরুতর লক্ষণযুক্ত রোগীদের জন্য এক ডজনেরও বেশি বড় বড় অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করা হয় সেখানে। করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় ১২ দিনেই হাসপাতাল তৈরির কথা তো সবারই জানা। তবে শুধু নিজেদের কথাই ভাবেনি দেশটি। অন্যান্য দেশে যেমন নিজ নাগরিককে যেতে দেয়নি অন্য দেশের নাগরিকদেরও প্রবেশ করতে দেয়নি নিজ দেশে। হংকংয়ের সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নিকোলাস টমাস বলেন, প্রথমদিকে যখন ব্যাপক পর্যায়ে সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হচ্ছিল তখন সেখানকার নাগরিকসহ অন্যান্যদের মধ্যে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায় সরকার ঠিক কাজটিই করেছিল। তা না হলে এর বিস্তার এতো তাড়াতাড়ি এতটা কমিয়ে আনা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না।

সিনহুয়া, বিবিসি, এবিসি ও গার্ডিয়ান অবলম্বনে তৌহিদুজ্জামান সোহানের কলাম…

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...