সমবায় সমিতি-নির্বাচন ও খ্রিষ্টান সমাজ
লেখক হিমেল রোজারিও

হিমেল রোজারিও

ভারতীয় উপমহাদেশে দরিদ্র কৃষকদের জন্য কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমবায় সমিতির উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দরিদ্র কৃষকরা যেনো মহাজনের সুদের কবল থেকে রক্ষা পায়, সেই চিন্তা করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে সমবায় সমিতি গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে সমবায় অঙ্গনে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য।

পবিত্র ক্রুশ সম্প্রদায়ের ফাদার চার্লস যোসেফ ইয়াং সিএসসি প্রায় ৬৬ বছর পূর্বে ঢাকায় কিছু খ্রিষ্টভক্ত নিয়ে সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। সেটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বড় সমবায় সমিতিতে পরিণত হয়েছে। সেটি হচ্ছে ঢাকা ক্রেডিট। এর পরপরই অন্যান্য সমিতির যাত্রা শুরু হয়। আমাদের খ্রিষ্টান সমাজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হচ্ছে সমবায় সমিতি। যা আমাদের প্রত্যেকের বিপদের বন্ধু। তাই আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম তার গানে বলেছেন, ‘দুঃখ জয়ের নবীন মন্ত্র সমবায়’।

কেনো সমবায় সমিতি
দরিদ্র কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সমবায় সমিতির যাত্রা শুরু হয় আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে। কিন্তু যুগের বিবর্তনে আজ সমবায় সমিতিগুলোতে বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। সেসকল প্রকল্পে ঋণ প্রদান করছে। বর্তমানে কোনো সমবায় সমিতি কৃষকদের কোনো ধরনের উন্নত মানের বীজ প্রদান অথবা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ বা সেমিনার প্রদান করে কিনা তা আমার জানা নেই। যদিও কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের জন্যই কিন্তু আমাদের এই সমবায় সমিতিগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক সমবায় সমিতি এখন বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করে সদস্যদের ডিভিডেন্ট প্রদান করছে। তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার কিন্তু যারা গ্রামের কৃষক আছেন তাদের কথা কিন্তু একবার চিন্তা করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: চৈত্রের শেষে

বর্তমান সমবায় সমিতি
বর্তমানে আমরা সমাবায় সমিতিগুলো থেকে বিভিন্ন ধরনের ঋণ পাচ্ছি। যা আমাদের প্রত্যেককে আরো একধাপ এগিয়ে যেতে অনেক বেশি সাহায্য করছে। আমাদের সমাজে আজ অনেকেই সমবায় সমিতির ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে আজ সমাজে প্রতিষ্ঠত ব্যবসায়ী। শিক্ষার জন্য, বিয়ের জন্য, বাড়ি-ঘর তৈরি করার জন্যও আমরা আজ ঋণ পাচ্ছি আমাদের সমবায় সমিতিগুলো থেকে। আমার পরিচিতি বেশ কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের জীবনের উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে গুরুত্ব পূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সমবায় সমিতি।

তাছাড়া ভোটের আগের রাতে নগদ টাকা বিতরণ হয়ে থাকে ভোটারদের মাঝে। আমরা সাধারণ সদস্যরা একবার চিন্তা করে দেখি না যে আজ যে ব্যক্তি আমাকে মদের এবং টাকার বিনিময়ে আমার একটি ভোটের জন্য ব্যবহার করছেন, নির্বাচনে জয় লাভ করার পরে সে যেকোনো ভাবে- যেকোনো মূল্যে সুযোগ-সুবিধা নিবেন। সামান্য স্বার্থের জন্য আমরা সাধারণ সদস্যরা কখনো কখনো এতো বোকা হয়ে যাই যে, একজন ব্যক্তি যিনি ক্লাস ফাইভ পাস করেছেন, কখনো বা ক্লাস ওয়ান পাস করেছেন তার কাছে আমার কষ্টের অর্জিত অর্থের দায়িত্ব দিচ্ছি।

কেউ কেউ জমি বিক্রয় করে এবং পেনশনের অর্থ দীর্ঘ মেয়াদের সমিতিতে ডিপোজিট করছে। সমবায় সমিতি হচ্ছে আমাদের লেন-দেনের একটি নিরাপদ স্থান। কারণ আমাদের লেনদেন ঠিক থাকলে অর্থের জন্য অন্য কোথাও হাত বাড়াতে হয় না। এক কথায় বলতে গেলে খ্রিষ্টান মানুষের জন্য প্রতিটি ক্রেডিট ইউনিয়ন মায়ের মতো। অনেক সময় আমাদের ভুলের কারণেই নিজেরাই সমস্যা তৈরি করে বসি এবং এক পর্যায়ে গিয়ে মানুষের বুদ্ধিতে সর্বশান্ত হই।

ঋণ গ্রহণ ও ঋণ ফেরত
আমরা যখন ঋণ গ্রহণ করি তখন অনেকেই আসল কারণটি গোপন করি। এর জন্য পরবর্তীতে সমিতিগুলোকে ঋণ খেলাপির হার বাড়ে। উৎপাদনমূলক কাজের জন্য ঋণ গ্রহণ না করে আমরা অনেক সময় অন্যের প্ররোচনায় সাধ্যের অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারি না। তখন নিজেদের পরিবারে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সাথে অশান্তির সৃষ্টি হয়।

সেই সাথে বিপাকে পড়ে ঋণ গ্রহণ করার সময় যারা জামিনদার হয়েছিলেন। আমাদের ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসব পালন করার জন্য অনেক সময় আমরা প্রতিযোগিতা করে থাকি। এই অশুভ প্রতিযোগিতায় জয় লাভ করার জন্য আমরা ক্রেডিট থেকে ঋণ গ্রহণ করে থাকি। যা একজন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের জন্য কখনোই কাম্য নয়।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: শেষ ইচ্ছা

নির্বাচন
বর্তমানে আমাদের সমবায় সমিতিগুলোর নির্বাচন যেনো জাতীয় নির্বাচনকে হার মানায়। নির্বাচনে যারা প্রার্থী তাদের অনেক সময় হিতাহিত জ্ঞান থাকে না ভোটে জয়ী হওয়ার জন্য। তখনই আরেকজন প্রার্থীর নামে দুর্নাম, মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে থাকে, যার অনেক সময় কোনো ভিত্তি থাকে না। বিরোধী দলের এই দুর্নাম ও অপবাদ দেওয়াটা আমাদের খ্রিষ্টান সমাজের একটি ট্রেডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সদস্যদের অনেক দাবি-দাওয়া থাকে। আমাদের মদ, বিড়ি-সিগারেট, ভুনা খিচুড়ি না খাওয়ালে ভোট দিবো না। তার অনেক অহংকার। আমার বাড়িতে সে ভোট চাইতে আসে নাই, সে একটা ছোট লোক, ওর বাবা এই করেছে সেই করেছে, ওর বোন কতো ভালো আমরা জানি না ইত্যাদি মন্তব্য আমরা করে থাকি। যা নির্বাচনের প্রার্থীদের জন্য রীতিমতো বিব্রতকর।

সদস্যদের কাছ থেকে ভোট পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়েন উঠেন নির্বাচনের মনোনীত প্রার্থীরা। সদস্যদের সন্তুষ্টি লাভের জন্য প্রার্থীরা যে কোনো নেশা জাতায় দ্রব্য প্রদান করে থাকেন। তাছাড়া ভোটের আগের রাতে নগদ টাকা বিতরণ হয়ে থাকে ভোটারদের মাঝে। আমরা সাধারণ সদস্যরা একবার চিন্তা করে দেখি না যে আজ যে ব্যক্তি আমাকে মদের এবং টাকার বিনিময়ে আমার একটি ভোটের জন্য ব্যবহার করছেন, নির্বাচনে জয় লাভ করার পরে সে যেকোনো ভাবে- যেকোনো মূল্যে সুযোগ-সুবিধা নিবেন। সামান্য স্বার্থের জন্য আমরা সাধারণ সদস্যরা কখনো কখনো এতো বোকা হয়ে যাই যে, একজন ব্যক্তি যিনি ক্লাস ফাইভ পাস করেছেন, কখনো বা ক্লাস ওয়ান পাস করেছেন তার কাছে আমার কষ্টের অর্জিত অর্থের দায়িত্ব দিচ্ছি।

কখনো কখনো দেখা যায় কিছু কিছু প্রার্থী পৈত্রিক জমি বিক্রয় করে ক্রেডিটের নির্বাচন করে থাকে এবং জয় লাভ করে। প্রার্থীর যদি কোনো লাভের সম্ভাবনা না থাকে তাহলে সে কোনো পৈত্রিক জমি বিক্রয় করবে? নির্বাচনে জয় লাভের পরে সে ব্যক্তি আপনার টাকা দিয়েই তার চেয়ে বেশি টাকা তুলে নিবে যে কোনো কৌশলে। সেই সাথে একটি ব্যালট পেপারে মোড়ানো ৫০০ টাকার একটি নোটের বিনিময়ে বিসর্জন দিচ্ছি আমার সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ আমার ক্ষুদ্র জীবনে চারটি সমবায় সমিতিতে নির্বাচনে প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ করার পরেই এই কথাগুলো এখানে তুলে ধরছি। তবে এইটুকু মনে রাখবেন, আজ যে নির্বাচনের পূর্বে প্রার্থীরা আপনাদের কাছে ১৫দিন ঘুরবে, আর আপনি তাদের পেছনে মাত্র তিন বছর ঘুরবেন। এখানে সিদ্ধান্ত নিবেন আপনি নিজে। আপনার বইয়ে যদি পরিমিত শেয়ার এবং জামিনদার ডিফোল্ডার না থাকে তাহলে আপনার ঋণ প্রদান করতে সমিতি বাধ্য থাকবে।

যে কোনো সমবায় সমিতিতে নির্বাচন হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ সদস্য। তাই নির্বাচন না করে সিলেকশন করাই ভালো- যদিও নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক অধিকার। উল্লেখ্য, সব সদস্য ও নির্বাচন প্রার্থী কিন্তু এক না। কিছু কিছু ব্যক্তির জন্য কথাগুলো প্রযোজ্য।

নির্বাচনের পরের অবস্থা
নির্বাচনের আগে আমাদের পছন্দের দল জেতানোর জন্য় আমারা মরিয়া হয়ে উঠি। একটু বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে উঠি। অনেক সময় নিজের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে কথা কাটাকাটি এবং মারামরি করি। অন্যের চরিত্র হননের চেষ্টা করি। এতে করে আমাদের দীর্ঘ দিনের আত্মীয়তা নষ্ট হয়। পরবর্তীতে তাদের কাছে যাবার আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না। বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে মদের আসরে বসে পছন্দের দলের প্রার্থীদেরকে বড় অংকের টাকা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে থাকি।

পরে নিজের পরিবারকে কষ্ট দিয়ে হলেও সেই টাকা প্রদান করতে হয়, কারণ তাকে কথা দেওয়া হয়েছে। ক্রেডিট নির্বাচনের আমেজ থাকে ১৫দিন কিন্তু এর ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী। জয়ী এবং পরাজয়ী দুই দলের প্রার্থীরা সবাই একটি আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে। যার প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষ করে পরাজিত হলে পরিবারে অনেক ধরনের অশান্তির সৃষ্টি হয়।

একটি সমিতির নির্বাচনে বেশি আবেগপ্রবণ না হয়ে বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে নিজে ভালো থাকা যায় এবং পরিবারকে ভালো রাখা যায়। এই পৃথিবীতে পরিবারের মানুষ ব্যতীত কেউ আপনজন নয়। প্রতিটি সমিতির নির্বাচন সুন্দর ও সুস্থ হোক এই প্রত্যাশা।

লেখক : গল্পকার, কবি ও সাংবাদিক, জাতীয় দৈনিক নতুন সময়।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...