ঈদ
লেখক সুরাইয়া শারমিন (ছবি: সংগৃহীত)

অফিস থেকে হাবিবউল্লাহ সরাসরি তার মেস বাসায় যায়। মনটা খুবই খারাপ। রাতে মুন্নীকে কল দিয়ে কি বলবে? বিয়ের পর থেকে এই পর্যন্ত হাবিবউল্লাহ পরিবার ছাড়া ঈদ করে নাই। আর ঈদের ছুটিতে গেলে বাচ্চাটা সারাক্ষণ কোল ছুঁয়ে থাকে। হাবিবউল্লাহ যেখানেই যাবে মেয়েও তার সাথে সাথে যাবে, বাচ্চাটা কত মন খারাপ করবে। তার ওপরে এবার আম্মাও মামার বাড়ি ঈদ করবে। বাড়ি খালি এই সব চিন্তা করতে করতেই মুন্নী তাকে কল দিলো।

কল রিসিভ করার সাথে সাথেই, মুন্নী বলে উঠে, তুমি ছুটি পাইছো? কালকে রওনা দিতে পারবা? আম্মা কিন্তু বিকাল বেলায়ই চলে গেছে। আর যাওয়ার আগে জয়নব খালারে কইয়া গেছে রাতে আম্মার ঘরে থাকতে। এই কথা শুনে হাবিবউল্লাহ খুশি হয়। এইবার হাবিবউল্লাহ বলে, মুন্নী, আমার কথা মন দিয়া শোন, আমি ছুটি পাই নাই। ঈদের সময় আমাগো অফিসের মালিক জাহিদ সাহেব, তার শাশুড়ি, বৌ-বাচ্চা নিয়ে সিংগাপুর যাবে। স্যারের শাশুড়ি অসুস্থ।

হাবিবুল্লাহর কথার মধ্যে মুন্নী বলে উঠে, তাতে তোমার কি? তুমি কেন ছুটি পাবে না! তুমি কি সিংগাপুর যাইবা? হাবিবউল্লাহর একটু লজ্জা লাগে। এটা ভেবে যে, মুন্নীকে কি ভাবে বলবে, সেই সময় সে স্যারের বাসায় থাকবে স্যারের মাকে দেখাশোনা করার জন্য, আর মুন্নী-ই বা কি ভাবে নিবে কথাটা।

>> এই লেখকের লেখা আরো পড়ুন: ঈদ (১ম পর্ব)

হাবিবউল্লাহ মুন্নীকে বলে, মুন্নী শোন, স্যার আমাকে অনেক বিশ্বাস করে, এটা তো তুমি জানোই। স্যার যখন থাকবে না তখন স্যারের বাসায় তার একটা অফিস রুম আছে সেখানকার দায়িত্ব আমাকে দিয়ে যাচ্ছে। ঈদের ছুটির সময়ও আমাদের অফিসে কাজ বন্ধ থাকে না। স্যার বসায় বসে অফিসের টুকটাক কাজ করেন। তুমি এত কিছু বুঝবে না।

আর স্যারের মা-ও একা থাকবেন বয়স্ক মানুষ। স্যার না থাকার সময় যদি কোন সমস্যা হয়। তাই আমাকে থাকতে হবে। মুন্নী অনেক বুদ্ধিমাতি। সে আর কথা বাড়ালো না। শুধু বলল এটা কোন কথা হইল। মেয়েটা কত আশা করে বসে আছে। তুমি আসলে, হিমু তোমার সাথে বাজারে গিয়ে একটা ছোট ছাগল কিনে আনবে কোরবানির জন্য। কথাটা বলতে বলতে মুন্নীর গলা ধরে আসে কান্নায়।

>> এই লেখকের লেখা আরো পড়ুন: সিদ্ধান্ত

হাবিবউল্লাহ বলে, শোন ঈদের পরের ছুটি এখনই স্যার সই করে দিছে।এই বার বাড়িতে দশদিন থাকবো। আর শোন, আম্মা না আসা পর্যন্ত জয়নব ফুপুরে যাইতে দিও না। মুন্নী বলে ঠেকার সময় কেউ থাকতে চায় না। হাবিবউল্লাহ বলে তুমি চিন্তা করো না। আমি কালকে জয়নব ফুপুর সাথে কথা বলবো।

শোন আমি যদি এবার ঈদে, ঈদের খরচ বাদ দিয়ে, সংসার খরচ বাদ দিয়ে, শুধু তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাই তবে কেমন হবে? মুন্নী বেগম বলে আমার টাকার দরকার নাই, তুমি আসো হিমু মন খারাপ করে আছে। তোমাকে ছাড়া বাচ্চাটা কেমনে ঈদ করবো?

পরের দিন অফিস হাফ করেই, হাবিবউল্লাহকে নিয়ে জাহিদ সাহেব বাসায় চলে আসে। আগেও হাবিবউল্লাহ এই বাসায় এসেছে, তবে অফিসের কাজে। আজ কেমন জানি অন্য রকম লাগছে। জাহিদ সাহেব তার মাকে নিয়ে বসার ঘরে আসলো। তার পর হাবিবউল্লাহর সাথে তার মাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। মা ও হলো হাবিব আমাদের অফিসে আমার সহকারী হিসাবে কাজ করে। হাবিব তারাতাড়ি বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় এবং সালাম দেয়।

জাহিদ সাহেবের মা কি সুন্দর করে বললেন, হাবিব তুমি বসো। দাঁড়িয়ে আছো কেন? এমন সময় কাজের লোক চা নিয়ে আসলো। সাথে অনেক নাস্তা হাবিবউল্লাহর লজ্জা লাগছিল। এবার জাহিদ সাহেব বললেন, হাবিব আমি একটু ফ্রেস হবো। তার পর আমরা সবাই এয়ারপোর্টে যাবো। তুমি নাস্তা করে নাও।

জাহিদ সাহেবের আম্মা টুকটাক কথা বলে ভেতরে চলে গেলেন। মানুষ বড়লোকদের কেন খারাপ বলে? হাবিবউল্লাহ বুঝতে পারে না! জাহিদ সাহেবের আম্মা কি সুন্দর করে কথা বললেন। আর চলে যাওয়ার সময় বলে গেলেন হাবিব তুমি আমাকে খালাম্মা বলবে, কেমন।

জাহিদ সাহেবের গলা পাওয়া যাচ্ছে,সবাইকে গাড়িতে উঠতে বলছে।এখনই এয়ারপোর্টের জন্য বের হবে। জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহর পাশে এসে বসলো। হাতে একটা খাম, জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহকে বলল হাবিব আমি দুঃখিত, আমার জন্য তোমার ঈদে বাড়ি যাওয়া হলো না।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: একটি তুলসী গাছের গল্প

হবিব আমার শাশুড়ি মা অনেক অসুস্থ তার একমাত্র মেয়ে তোমাদের ভাবি, আমারও তো মেয়ের জামাই হিসাবে একটা দায়িত্ব আছে ওনার প্রতি। কারণ আমি ওনাকেও মা ডাকি, উনিও আমার মা আর আমার আম্মাকে ছেড়েও, আমি এখন পর্যন্ত কোন ঈদ করি নাই। আমার আব্বা মারা যাওয়ার পর থেকে, আমি আম্মাকে কখনো একা রাখে, কোথাও যাই নাই।

আমি যখন দেশের বাহিরে কাজে যাই। তখন তোমার ভাবি থাকে আম্মার সাথে, হাবিব আমরা মানুষ। আমাদের একজনের অন্যজনের সাহায্যে লাগে অন্য জনের প্রয়োজনে। নাও এই খামটা রাখো। এটাকে তুমি ভেব না আমার আম্মার সাথে থাকার প্রতিদান। এটা আমার তরফ থেকে তোমার বৌ-বাচ্চার জন্য ঈদ উপহার।

সবাই মিলে এয়ারপোর্টে গেলো জাহিদ সাহেবদের সাথে, এয়ারপোর্টে সবাই মিলে কফি খাওয়ার সময়ও, হাবিবউল্লাহর খুব ভালো লাগছিল। মনে হচ্ছিল সবাই এক পরিবারের। জাহিদ সাহেব বলে গেছে আজ রাতেই প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র নিয়ে স্যারের বাসায় চলে যেতে।হাবিবউল্লাহ তার মেস বাসায় গিয়ে খামটা খুলে। খামের ভেতরে বিশ হাজার টাকা। হঠাৎ করে হাবিবউল্লাহর মনটা খুশিতে ভরে গেলো।

তার নিজের বোনাস-বেতন আর এই বিশ হাজার টাকা মিলে তার কাছে এখন অনেক টাকা। ঈদের পরে বাড়িতে গিয়ে মুন্নীর জন্য একটা সুন্দর গোসলখানা বানিয়ে দেবে। মুন্নীর অনেক দিনের শখ একটা দেয়াল ঘেরা গোসলখানার।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: অনলাইন কেনাকাটা ও আমার কথা

মুন্নী বেগমকে হাবিবউল্লাহ কল দেয়, মুন্নী রাগ করে আছে কথাই বলতে চাইছে না। হাবিবউল্লাহ তখন মুন্নীকে বলে। শোন আমি যদি এবার ঈদে, ঈদের খরচ বাদ দিয়ে, সংসার খরচ বাদ দিয়ে, শুধু তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাই তবে কেমন হবে? মুন্নী বেগম বলে আমার টাকার দরকার নাই, তুমি আসো হিমু মন খারাপ করে আছে। তোমাকে ছাড়া বাচ্চাটা কেমনে ঈদ করবো?

হাবিবউল্লাহর আবার মন খারাপ হয়ে যায়। হাবিবউল্লাহ মুন্নীকে বলে, মুন্নী শোন, আমি কালকে টাকা পাঠাবো তুমি হিমুকে একটা নতুন জামা কিনে দিবে। আর একটা ছোট ছাগল কিনবা কোরবানির জন্য। তোমার জন্য আমি আসার সময়, একটা সুন্দর শাড়ি কিনে আনবো ঢাকা থেকে। জয়নব ফুপুকে এই কয়দিন থাকতে বলবা। তার জন্য একটা শাড়ি কিনে দিবা। সে খুশি মনে থাকবে তোমাদের সাথে।

মুন্নী বলে, আরে শাড়ি দিতে হবে না। দুইশো টাকা দিলে পান কিনে খাবে, খুশি হয়ে যাবে। হাবিবউল্লাহ তখন বলে। মুন্নী সে তোমার বিপদে তোমার পাশে আছে। তোমাকে তার সন্মান করতে হবে। শাড়ি কিনে দিবে আর পাঁচশ টাকাও দিবে।

হাবিবউল্লাহ জয়নব ফুপুর হাসি-হাসি মুখটা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে।হাবিবউল্লাহ জাহিদ সাহেবের বাসায় চলে এসেছে কি সুন্দর ছবির মতো রুম। সকালে-বিকালে মজার মজার খাবার খায়। আর হাবিবউল্লাহর শুধু মনে হয় আহারে, মুন্নী বেগম আর হিমুর ঢাকা শহর দেখার কত সখ, হাবিবউল্লাহ মেসে থাকে তাই তাদের ঢাকা দেখাতে আনতে পারে না! এত সুন্দর বাসায় থাকা আল্লাহ তার ভাগ্যে রেখেছে! যদি মুন্নী আর হিমুকে নিয়ে একদিন এমন বাসায় থাকতে পারতো!

কাজের মেয়েটা ডাকতে এসেছে, খালাম্মা ডাকছে হাবিবউল্লাহকে ডাকে পাঠিয়েছে, খালাম্মা হাবিবউল্লাহকে বললেন, হাবিব তুমি দারোয়ানকে নিয়ে হাটে যাও। আর একটা গরু কিনে আনো কোরবানির জন্য। হাবিব গরুর হাটে চলে গেলো গরু কিনতে। হাবিবউল্লাহ গরুর হাটে গিয়েও, গরু না দেখে শুধু ছোট ছোট ছাগলের দাম করে দেখে দারোয়ান আব্বাস বলে উঠে, ভাইজান গরু কিনতে আইস্যা ছাগল দেখেন কেন?

হাবিবউল্লাহ কিছু বলে না তার চোখে ভেসে ওঠে মেয়েটার মুখ। এই ঈদে হিমু তার বাবার হাত ধরে একটা ছোট্ট ছাগল কিনতে চেয়েছিলো । হাবিবউল্লাহ মনে মনে বলে, আমি আমার মেয়ের খুশি কোরবানি দিলাম অন্যের খুশির জন্য। (চলবে. . .)

লেখক : সুরাইয়া শারমিন, উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...