জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহ
লেখক সুরাইয়া শারমিন (ছবি: সংগৃহীত)

হাবিবউল্লাহ একটা ছোট-খাটো বাইং অফিসে চাকরি করেন। ঈদের সময় যেহেতু তৈরী পোশাক কারখানাগুলি বন্ধ থাকে বেশ কয়দিন, সেহেতু হাবিবউল্লাহদের বাইং অফিসও বন্ধ থাকে। হাবিবউল্লাহর পরিবার থাকে গ্রামের বাড়িতে।

হাবিবউল্লাহর পরিবার বলতে এক মা, তার বৌ মুন্নী বেগম আর মেয়ে হুমায়রা। হাবিবউল্লাহ তার মেয়েকে হিমু বলে ডাকে। অফিসে ভালো মানুষ বলে হাবিবউল্লাহর খুব সুনাম আছে। বস তাকে খুবই বিশ্বাস করেন। হাবিবউল্লাহ’র কাজ বসের সাথে সাথে থাকা। এই কারণে তার একটা সুবিধা আছে, সবাই হাবিবউল্লাহকে একটু তোয়াজ করে।

>> এই লেখকের আরো লেখা পড়ুন: একটি তুলসী গাছের গল্প

বসের মন মরজির খবর জানতে হলে, হাবিবউল্লাহকে কাছে ডেকে এক কাপ চা খাওয়াবে আর বলবে, আরে তুমিতো ভাই বসের খাস লোক, বলো তো বসের মন মেজাজ এখন কেমন আছে? আমার একটু ছুটি দরকার। বসকে বললে আবার রেগে যাবে নাতো?

জাহিদ সাহেব বললেন, হাবিব তুমি এবার ঈদের ছুটিটা নিও না। ঈদের পরে তুমি বেশি করে ছুটি নিও। আমি তোমার ঈদের পরের ছুটিটা এখনই মঞ্জুর করে দেবো। স্যার ঈদে কি অফিস খোলা থাকবে? বোকার মতো বলে বসে হাবিবউল্লাহ।

সব চাইতে বড় একটা ভালো দিক হলো তার পেছনে কেউ লাগে না। আর খারাপ দিকটা হলো, সে বসের সাথে সাথে থাকার ফলে অফিসের কোন কাজই তার শেখা হয়ে উঠে নাই। যার ফলে অন্য কোনো অফিসে চলে যাওয়া সম্ভব না। এই সেক্টরে নিজের উন্নতির জন্য কাজ শিখতে হয় এবং অফিস চেঞ্জ করতে হয়। আর তেমন কোনো কাজ না জানায় তার বেতনও খুবই কম।

>> এই লেখকের লেখা আরো পড়ুন: সিদ্ধান্ত

হাবিবউল্লাহ তার বস জাহিদ সাহেবকে খুবই পছন্দ করে। কারণ হাবিবউল্লাহকে নিয়ে যখন জাহিদ সাহেব কোথায় যান তখন গাড়ির মধ্যে হাবিবউল্লাহ’র সাথে তার মা আর পরিবারের অন্যদের নিয়ে আলাপ করেন। গতকাল জাহিদ সাহেব খুবই মুড অফ করে বসে ছিলেন গাড়িতে। ঢাকার বাইরে কোনো অফিসে গেলে সাধারণত গল্প করেন রাস্তায়।

হাবিবউল্লাহ খুবই চিন্তায় আছেন কারণ গতকাল মুন্নী কল দিয়ে বলেছে। এবার ঈদ হাবিবউল্লাহর মা, তার বাবার বাড়িতে করবে হাবিবউল্লাহ অন্য খালারাও আসবে সেখানে। হাবিবউল্লাহ যেন একদিন আগেই ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আসে। শাশুড়ি ছাড়া মুন্নীর একা-একা বাড়িতে ভয় করে।

>> এই লেখকের লেখা আরো পড়ুন: অনলাইন কেনাকাটা ও আমার কথা

জাহিদ সাহেবের মুড কেন খারাপ তা হাবিবউল্লাহ ধরতে পারছে না। এমন সময় ছুটি চাওয়া কি ঠিক হবে? এমন সময় হাবিবউল্লাহর ডাক আসে জাহিদ সাহেবের রুম থেকে। হাবিবউল্লাহকে রুমে ঢুকতে দেখে জাহিদ সাহেব আচ্ছা পড়ে কথা বলছি বলে কলটা কেটে দিলেন।

জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহকে বললেন, বসো হাবিব। তোমার সাথে একটু কথা বলি। ইতোমধ্যেই একজন এসে জাহিদ সাহেবের পিওনকে দুকাপ চা আর একটা প্লেটে একটা সুন্দর কাপ কেক দিয়ে গেলেন। হাবিবউল্লাহর ভয় করছে স্যার তাকে কি বলার জন্য রুমে ডেকেছেন? আর স্যারের সাথে অফিস রুমে চা খাওয়ার কথা, তার অনেক ওপরের পোস্টের কেউ ভাবতে পারবে না।

জাহিদ সাহেব বললেন, চা খেতে খেতে কথা বলি হাবিব।কেকটা তার দিকে দিয়ে বললেন খাও, আমি শুধু চা খাবো। বসের সামনে কেক খেতে হাবিবুল্লাহর লজ্জা লাগছে। তার পরেও বস বললে না খেয়ে উপায় নাই। হঠাৎ করে বস কথা বলা শুরু করলেন এবং প্রথমেই যে কথাটা বললেন তা শুনে হাবিবউল্লাহর মুখ শুকিয়ে গেলো।

জাহিদ সাহেব বললেন, হাবিব তুমি এবার ঈদের ছুটিটা নিও না। ঈদের পরে তুমি বেশি করে ছুটি নিও। আমি তোমার ঈদের পরের ছুটিটা এখনই মঞ্জুর করে দেবো। স্যার ঈদে কি অফিস খোলা থাকবে? বোকার মতো বলে বসে হাবিবউল্লাহ।

তখন জাহিদ সাহেব বলেন, হাবিব শোন, আমি একটা বড়সড় বিপদে পড়েছি।তোমাদের ভাবির আম্মা একটু অসুস্থ উনি ডাক্তার দেখাতে সিঙ্গাপুর যাবেন। সাথে তোমার ভাবি ও আমার যাওয়ার কথা রয়েছে। একমাত্র ঈদের সময় মেয়ের ইস্কুলসহ আমাদের সবার ছুটি থাকে। অনেকদিন একসাথে আমরাও কোথাও বেড়াতে যাই না। তাই তোমার ভাবি ঠিক করেছে, এবার ঈদের ছুটিতে ওর মাকে ডাক্তার দেখানো এবং আমাদের বেড়ানো সব একসাথে হবে।

কিন্তু আরেকটা বিরাট সমস্যা হলো- আমার আম্মা কি ভাবে একা ঈদ করবে? আম্মা’র সাথে কে থাকবে? ড্রাইভার ছুটিতে যাবে। শুধু একটা কাজের লোকের কাছে আম্মাকে কিভাবে রেখে যাবো? আর আম্মা কখনোই ঈদ দেশের বাহিরে করবে না। আর কোরবানির একটা বিষয় আছে। গরু কেনা লোক নিয়ে কোরবানি করা। তাই বলছিলাম তুমি যদি ঈদে বাড়িতে না যেতে। আমার অবর্তমানে আমাদের বাসায় আম্মার সাথে থাকতে, তবে আমি নিশ্চিন্তে বাহিরে যেতে পারতাম। আমি তোমার ওপরে ভরসা করতে পারি।

হাবিবউল্লাহ ভাবছে সে স্যারকে কি বলবে। স্যার তাকে এত কাছের মানুষ ভাবে। ওই দিকে মুন্নী একা তার মেয়েটা এবার আবদার করে বসে আছে। বাবা এবার আমরা একটা ছাগল কোরবানি করবো। মুন্নী ও বলছে বাচ্চাটা এত সখ করছে একটা ছোট ছাগল কিনে আনো।

এমন সময় হাবিবউল্লাহর মোবাইলটা বেজে ওঠে। মুন্নীর কল। সে কলটা কেটে দিতে গেলে জাহিদ সাহেব বলেন কল রিসিভ করো কথা বলো। কল রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে তার মেয়ে হিমু বলে উঠে বাবা তুমি কখন আসবে? আমরা ছাগল কিনতে যাবো না। হাবিবউল্লাহ তখন বলে মা তোমার আম্মুকে দাও। হাবিবউল্লাহ মুন্নীকে বলেন, আমি স্যারের রুমে। তোমাকে পরে কল দিবো। বলেই মোবাইলে কলটা কেটে দেয়।

জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহকে বলেন, তুমি তোমার পরিবারের সাথে কথা বলে আমাকে জানাও। তুমি বাড়িতে ঈদ করতে না গেলে ওদেরও তো কোন সমস্যা হতে পারে, তাই না। হাবিবউল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে সে এবার বাড়িতে ঈদ করতে যাবে না। সে তার স্যারের বাসায় থাকবে। হাবিবউল্লাহ বলে, স্যার আপনি সিংগাপুর যান। কোনো সমস্যা নাই আমি খালাম্মা জানের সাথে থাকবো।

জাহিদ সাহেব হাবিবউল্লাহকে বলে। হাবিব তোমার পরিবারের মোবাইল নম্বরটা আমাকে দাও। হাবিবউল্লাহ কিছুটা অবাক হয়! তার মনে হয় স্যার যেহেতু একা বাসায় তাকে রেখে বিদেশ যাচ্ছেন তাই হয় তো নম্বরটা চাচ্ছেন। মুন্নী বেগমের মোবাইল নম্বরটা চাইছেন।

মনটা একটু খারাপ হলো। স্যার তাকে পুরাপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। হাবিবউল্লাহ একটা কাগজে মোবাইল নম্বরটা লিখে তার নীচে নাম লিখে, মুন্নী বেগম, হিমুর মা। হাবিবউল্লাহ রুম থেকে বের হলে পরে। জাহিদ সাহেব তার বৌ নিতুকে কল দেন। বলেন নিতু সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। হাবিব আম্মার সাথে থাকবে। আমরা নিশ্চিন্তে সিংগাপুর যেতে পারবো। ( চলবে. . .)

লেখক : সুরাইয়া শারমিন, উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী, অনলাইন প্লাটফর্ম ‘সুরাইয়া’।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...