ওর কথা এখন আর কেউ বলে না
ছবি : সংগৃহীত

নয়ন যোসেফ গমেজ, সিএসসি

রূপকথা আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে। বড্ড সাদাসিধে। সচরাচর মেয়েরা সাদাসিধে থাকতে ভালবাসে না। অথচ রূপকথা! রূপকথা যেন সাদাসিধে থাকতেই বেশি ভালবাসে। একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও রূপকথা রীতিমত অসাধারণ।

ওর হাসি নির্মল। চাহনিতে জটিলতা নেই। কথায় নেই ঘুর-প্যাঁচ। রূপকথার বড় দুবোনের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারে তাই রূপকথার ভূমিকা অনেক। সংসারী কাজে ও বেশ পটু। বাড়িতে বিভিন্ন কাজে রূপকথার হাত পড়লে মনে হয় ও যেন আড়াই বছরের পুরনো গ্রামীণ গৃহবধূ।

রূপকথাকে নিয়ে মায়ের তেমন ভাবনা নেই। মা জানেন, রূপকথা তার লক্ষ্মী মেয়ে। এই মেয়ে যে সংসারে যাবে সে সংসারে সুখের অভাব হবে না। আসলেই যে মেয়ে নিজে সুখী সে কখনোই পরকে অসুখী করতে পারে না। হয়তো চেষ্টা করলেও না। শৈশব থেকে পড়াশোনায়ও রূপকথার বেশ নাম।

আমরা পাশাপাশি গ্রামে এক সাথে বেড়ে উঠেছি। হেসে-খেলে অনেকটা পথ একসাথে পাড়ি দিয়েছি। সেই পথে আরো অনেকেই ছিল। আমরা ছিলাম অনেকের মধ্যেই। বুঝিনি, কখন থেকে রূপকথার প্রতি আমার দুর্বলতার শুরু। সে কথা রূপকথাও বুঝেনি। তবে একদিন ঠিকই বুঝে গিয়েছিলাম, রূপকথা আমাকে রীতিমত পেয়ে বসেছে। যেন কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। নয়তো আমার মনোরাজ্যে ও সারাক্ষণ ঘুর-ঘুর করবে কেন? আমার কল্পনার রাজ্যে ও দেবী হবে কেন?

ওর কথা এখন আর কেউ বলে না
নির্জনে বসে গল্প লিখছেন লেখক নয়ন যোসেফ গমেজ, সিএসসি;

পারিনি, রূপকথাকে আমার ভেতরে লুকিয়ে রাখতে চেয়েও পারিনি। জানিনা এ আমার অপরাধ কিনা? রূপকথাকে আমার ভেতরের কথাগুলো আদৌ মুখে বলা হয়নি। বলতে চেয়েও পারিনি। আসলে কাছের মানুষকে, অতিপরিচিত মানুষকে অনায়াসে মনের কথা বলা যায় না। হাজার চেষ্টা করেও না।

হ্যাঁ, রূপকথার সাথে আমি কখনোই অতটা ফ্রি ছিলাম না, যতটা ফ্রি হয়েছি নাম-লেখার পর। নাম-লেখার আগে রূপকথাকে আমি মুখের ভাষায় আমার মনের কথা তেমন বলিনি; অথচ কলমে বলেছি অনেক। তবে চিঠিতে নয়। জীবনের ছন্দবিহীন যাত্রাপথে হাঁটতে-হাঁটতে একটি মেয়েকে একটি ছেলের ভাল লাগতেই পারে। ভাল লাগাটাই তো স্বাভাবিক।

রূপকথা বড্ড সাদাসিধে। সচরাচর মেয়েরা সাদাসিধে থাকতে ভালবাসে না। অথচ রূপকথা! রূপকথা যেন সাদাসিধে থাকতেই বেশি ভালবাসে। একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও রূপকথা রীতিমত অসাধারণ।

একটা সময় আবার সবকিছু মিলিয়ে যায়। তখন আর কোন ভাল লাগা কাজ করে না। কিন্তু আমার বেলায় তা ঘটেনি। আমি বুঝতেই পারছিলাম- আমার ভেতরে রূপকথার প্রতি ভাল-লাগা ভালবাসায় পরিণত হচ্ছে। যেন মাটির ঢিবি পাহাড়ে রূপান্তরিত হচ্ছে।

একথা সত্য, শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে গিয়ে যেকোন মেয়েকেই ভাল লাগতো। আজ হয়তো একে, কাল আবার অন্যজনকে। তখন কাছাকাছি থাকতে ইচ্ছে হতো। মন চাইতো একসাথে লুকোচুরি খেলতে। ইচ্ছে হতো নির্জনে কোথাও গিয়ে মেয়েটির সাথে কথা বলতে। অথচ একটা সময় কেবল রূপকথা-ই আমার মনের আঙিনায় থেকে গেল। আর অন্য কোন মেয়ে নয়। রূপকথা-ই হল আমার সারাক্ষণের ধ্যান-জ্ঞান।

এভাবেই একটা সময় আমি রূপকথাকে আমার সবই ভাবতে শুরু করেছি। আমার বন্ধু, আমার সাথী আর আমার সব…। লিখেছি কবিতার পর কবিতা। অথচ, প্রকাশ করিনি একটাও। আসলেই প্রেমে পড়লে মানুষ কবি হয়। প্রেম ছাড়া কলমের কালি কবিতার জন্ম দেয় না। কিন্তু হায়রে, মানুষের হৃদয়ের মত আমার কবিতাগুলো চাপা পড়ে আছে অন্ধকারে; পুরনো ডায়েরির ধূসর পাতায় । সেখানে আদৌ আলো পৌঁছেনি।

কতবার সংকল্প করেছি- রূপকথাকে আমি সব কথা বলে দেব। কেননা, না বলে-বলে আমি নিজেই নিজের কাছে রীতিমত অপরাধী হয়ে যাচ্ছি। আর তাছাড়া আমার ভেতরকার কথাগুলো তো আমার নয়, রূপকথার। মাঝে মাঝে আফসোস্ হতো-ইস্! রূপকথা যদি আমার হৃদয়টা বুঝতে পারতো! ও যদি একটু উপলব্দি করতে পারতো আমার যৌবন মনের গতি-প্রকৃতি। কিন্তু হায়রে! তা বুঝতাম কেবল এই আমি-ই। তা উপলব্ধি করতাম কেবল এই আমি-ই।

আমি যদি ওকে আমার হৃদয়টা দেখাতে পারতাম…! রূপকথা অপরাধী নয়; অপরাধী আমি। আমিই প্রথম ওর অজান্তে ওকে ভালবাসতে শুরু করেছি। এজন্য-ই ওর জীবনে ছন্দপতন নেই। ছন্দপতন ঘটছে কেবল আমার-ই জীবনে।

রূপকথা চলছে নিজের মত, ছন্দে-ছন্দে জীবনানন্দে…। আমি চলছি নদীর মতো। একূল-ওকূল ছাপিয়ে গভীর নদীর মতো। গভীর নদীতে স্রোত বয়ে যাওয়ার শব্দ কম। এমননদীতে উপর থেকে অনেক সময় আচ্ করা-ই যায় না যে, স্রোত বয়ে যাচ্ছে। অথচ স্রোত বয়ে যাচ্ছে স্রোতের নিয়মে। সে কারো বারণ-বাধা মানছে-ই না…।

রূপকথাকে নিয়ে মায়ের তেমন ভাবনা নেই। মা জানেন, রূপকথা তার লক্ষ্মী মেয়ে। এই মেয়ে যে সংসারে যাবে সে সংসারে সুখের অভাব হবে না।

মানুষের হৃদয়ে যতক্ষণ প্রেম আসে না ততোক্ষণ তা শুষ্কভূমি। কিন্তু যখন একবার আসে তখন একনাগারে তা আসে প্রবল ঝরণাধারার মতো। সেই প্রবল ঝরণাধারাকে আটকিয়ে কিংবা থামিয়ে রাখার সাধ্য কারো নেই। অত্যন্ত কোন মানুষের নেই। আমিও তা পারিনি। হৃদয় গভীরে জোয়ার-ভাঁটা আর ঝরণাধারার কারসাজি সইতে না পেরে আমার গল্প লেখা শুরু।

আমার ছোট প্রাণের ছোট ব্যথা এবং ছোট-ছোট দুঃখকথা নিয়ে ছোটগল্প। গল্পে আলো-আাধাঁরির খেলা খেলতে-খেলতে এককথায়-দুইকথায় সব কথা জেনে গেল রূপকথা। জেনে গেল আমার স্বজন ও বন্ধুমহল; আমি রূপকথাকে ভালবাসি। হ্যাঁ, আমি তো রূপকথাকেই ভালবাসি। আমি তো আমার হৃদ-মন্দিরে নীরবে নিভৃতে ওর-ই আরাধনা করছি এতোদিন।

ওই-ই তো আমার হৃদ-মন্দিরের দেবী। এরপর চললো ধুমসে গল্প লেখা। গল্পের নায়িকা রূপকথা আমার গল্পের নিয়মিত পাঠিকা। ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেল অনেকগুলো শীত ও বসন্ত। গ্রামের দিদি-বৌদিদের মধ্যে অনেক দিন ধরেই চালাচালি হচ্ছে একটাই গুঞ্জন-আমি রূপকথাকে ভালবাসি। আমি রূপকথার সাথে প্রেম করি। আমি রূপকথাকে বিয়ে করবো…।

দেখতে-দেখতে এবারের শীতে রূপকথার অ্যাঙ্গেজমেন্ট হয়ে গেল। আমার গল্পের নায়িকার এবার বিয়ে। এতোদিন রূপকথা গল্পে বধূ সেঁজেছে। গল্পে মা হয়ে, রমণী হয়ে ঘরকন্যার কাজ করেছে। এবার গল্প থেকে রূপকথার ছুটি হবে।

আমি স্মিত হেসে বললাম, জানো রূপকথা, রাতের সব তারা-ই লুকিয়ে থাকবে দিনের আলোর গভীরে। আর তা থাকবে ততোদিন, যতোদিন পৃথিবী থাকবে…।

এক পড়ন্ত বিকেলে আমি একাকি বসে রূপকথাকে আমার গল্প থেকে ছুটি দেবার কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ দেখি রূপকথা আমাদের বাড়িতে হাজির। সঙ্গে ওর দু’জন বান্ধবী। আমার মায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। অতিথি আপ্যায়ন শেষে আমরা হাঁটতে-হাঁটতে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। রূপকথা নীরব। ওর বান্ধবীরা স্মিত হেসে একের পর এক নানা বিষয়ে কথা বলছে।

একপর্যায়ে রূপকথা জানতে চাইলো আমি এখনো তাকে ভালবাসি কিনা। তার প্রতি আমার ভালবাসা কতোদিন অটুট থাকবে। আমি স্মিত হেসে বললাম, জানো রূপকথা, রাতের সব তারা-ই লুকিয়ে থাকবে দিনের আলোর গভীরে। আর তা থাকবে ততোদিন, যতোদিন পৃথিবী থাকবে…।

একদিন একটি অনুষ্ঠানে হঠাৎ এক অপরিচিত যুবক আমার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দিল। সৌজন্যবশত হাত মিলানোর সঙ্গে সঙ্গেই যুবকটি বলল- আমি রূপম, রূপকথার স্বামী। আপনি রূপকথাকে চিনেন? আমি বললাম, রূপকথা, হ্যাঁ! রূপকথা আমাদের পাশের গ্রামের মেয়ে। বড্ড সাদাসিধে…।

লেখক: সন্ন্যাসব্রতধারী, পবিত্র ক্রুশ যাজক সংঘ, রামপুরা, ঢাকা।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...