লাশ রহস্য (চতুর্থ পর্ব)
লেখক সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

গতকাল রাতের পর থেকে আজকে পর্যন্ত সারাদিন শরীরের উপর খুব ধকল গেছে। বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। টানা আধাঘন্টা আইস বাথ নিয়ে আসার পথে দোকান থেকে আনা স্যান্ডুইচ আর জুস খেয়ে শুয়ে পরলাম। ‌মুহূর্তেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সকাল সাতটায় ওয়াহিদ সােহেবর ফোনে ঘুম ভাঙলো।

-হ্যালো, মি. থমাস, ঘুমাচ্ছেন? আপনাদেরই সুখ। আমার কি আর আপনাদের মত শান্তিতে ঘুমাবার উপায় আছে?
-আসল কথাটা বলুন জামান সাহেব।
-হবে আাবার কি বলুন, রাতে বান্দরবানে পাঁচটা কবরস্থানে লাশ চুরি হয়েছে। আমার মাথা পুরোপুরি খারাপ হওয়ার আগে কিছু একটা করুন।

জামান সাহেবের কথা শুনতে শুনতে একটা সিগারেট জ্বালালাম। কিছুক্ষণ ভেবে বললাম,
-জামান সাহেব, ব্যাগ গুছিয়ে নিন আর গাড়ির ব্যবস্থা করে রাখুন, দশটার মধ্যে বান্দরবানের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়তে হবে।
ফোনটা রেখে, ফ্রেশ হয়ে এক কাপ কড়া কফি আর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি জানতাম লাশ চোরেরা একটা না একটা ভুল করবেই, সেই ভুলটাই যথেষ্ট ওদেরকে ধরার জন্য। পরশু আমরা ওদের কে ধরার চেষ্টা করেছি আর গতকাল রাতেই আবার চুরি হয়েছে। একদিনে মধ্যে প্ল্যান করে দূরে কোথাও চুরি করা সম্ভব না। তার মানে চোরের ঘাটি বান্দরবানেই কোথাও হবে।

আমি আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে রওনা হলাম জামান সাহেবের কোয়ার্টারের দিকে।
সকাল এগারোটা, ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে আমাদের পুলিশ ভ্যান সাঁসাঁ করে ছুটে চলেছে। জামান সাহেব গম্ভীর মুখে গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছেন।
-জামান সাহেব, বান্দরবানে প্রবেশ নিষিদ্ধ জায়গাগুলোর একটা ম্যাপ পাওয়া যাবে কি?

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : লাশ রহস্য (তৃতীয় পর্ব)

জামান সাহেব বান্দরবান সদর থানায় যোগাযোগ করে হোয়াটসঅ্যাপে একটা ম্যাপের ব্যবস্থা করলেন। আমি ম্যাপে চোখ বুলাতে লাগলাম। হঠাৎ এক জায়গায় লাল রঙের বিপদসূচক চিহ্নে চোখ আটকে গেল। জুম করতেই ‘স্নেক ইয়ার্ড’ নাম ভেসে উঠলো। জামান সাহেবকে বললাম ‘স্নেক ইয়ার্ড’ এর ব্যাপারে সম্পূর্ণ খোঁজ-খবর নিতে।

নিলাচল পর্যটন কেন্দ্র-এর উত্তর দিকে একটা ঘন জঙ্গল আছে। তার নামই ‘স্নেক ইয়ার্ড’। ওখানে হাজার প্রজাতির সাপের বিচরণ। ওখানে কেউ গেলে সাপের ছোবলে তার মৃত্যু নিশ্চিত। তাই ওই জঙ্গলে প্রবেশ সরাকারিভাবে নিষিদ্ধ। গত পাঁচ বছর আগে হঠাৎ করেই এখানে বিভিন্ন অচেনা প্রজাতির সাপের আগমন ঘটে, তার আগে এ জঙ্গল সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলো। আর গত তিন বছর আগে ‘স্নেক ইয়ার্ড’ এর সীমানা ঘেষে বাংলাদেশের সবথেকে বিখ্যাত পারফিউম কোম্পানি ‘স্নেক ড্রাগন’ এর ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। ‘স্নেক ইয়ার্ড’ সম্পর্কে এই তথ্যগুলো জামান সাহেব জোগাড় করে দিলেন।

কয়েকটা বিষয় একটু গোলমেলে লাগছে। হঠাৎ করে একটা জঙ্গলে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়া তার দুবছরের মাথায় সেই জঙ্গল ঘেসে পারফিউম ফ্যাক্টরি তার উপর নাম ও স্নেক দিয়েই শুরু। মনে হচ্ছে ‘স্নেক ইয়ার্ড’ ও ‘স্নেক ড্রাগন’ এর মধ্যে কোন যোগ সূত্র আছে। কিন্তু আপাতত আমাকে লাশ চুরির বিষয়টি নিয়েই ভাবতে হবে।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ বান্দরবান পৌঁছালাম। ‘স্নেক ইয়ার্ড’- এর কাছাকাছি একটা সেনা ঘাঁটিতে গিয়ে উঠলাম আমরা। সেনা কমান্ডার মতিউর সাহেবের কাছ থেকে ‘স্নেক ইয়ার্ড’ এর বিষয়টা আরেকটু ক্লিয়ার হয়ে নিলাম।

‘স্নেক ইয়ার্ড’এর ব্যাপারে এত উৎসাহ দেখে ওয়াহিদ সাহেব যথেষ্ট বিরক্ত হচ্ছেন। আমি জোর করায় সন্ধ্যায় তিনি আমার সাথে সাথে ‘স্নেক ড্রাগন’ পারফিউমের ফ্যাক্টরিতে ঘুরতে গেলেন। বিশাল জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে ‘স্নেক ড্রাগন’। ফটকের একপাশে বিশাল অজগর ও অন্য পাশে বিশাল ড্রাগনের মূর্তি। ফটকের গায়ে বড় করে লেখা ‘প্রবেশ সংরক্ষিত’। সেনাবাহিনীর গাড়ি দেখে আমাদের জন্য ফটক খুলে দেওয়া হল। গাড়ির দরজা খুলে নামতেই পারফিউমের গন্ধে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। ‘স্নেক ড্রাগনে’র পারফিউমের প্রতি আমার দুর্বলতা আগে থেকেই। হঠাৎ ম্যানেজার এসে বললেন,

-স্যার, আপনাদের মধ্যে মি. থমাস কে?
উনার প্রশ্নে একটু চমকে উঠলাম, এখানেও আমার নাম জানা লোক থাকতে পারে আশা করিনি।

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...