লাশ রহস্য
লেখক সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

-স্যার আপনাদের মধ্যে মি. থমাস কে?

উনার প্রশ্নে একটু চমকে উঠলাম, এখানেও আমার নাম জানা লোক থাকতে পারে আশা করিনি।

-জ্বি, আমি।

-আমাদের বস আপনাদেরকে তার অফিসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আপনারা দয়া করে আামার সাথে আসুন।

অফিসে ঢুকতেই অবাক হয়ে গেলাম। বাংলাদেশের ফরেনসিক বিভাগের সব থেকে বড় ডাক্তার মি. জাবেদ চৌধুরী চেয়ারে বসে আছেন। আমরা ভেতরে ঢুকতেই তিনি সসম্মানে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।

-আসুন মি. থমাস। আপনাকে বান্দরবানে দেখে খুবই চমৎকৃত হলাম।

-আমি ও আপনাকে ‘স্নেক ড্রাগনে’র সর্বোচ্চ চেয়ারে দেখে খুবই অবাক হলাম।

-হা হা হা, থমাস বাবু, ছোটবেলা থেকেই পারফিউমের প্রতি আমার ভালো লাগাটা একটু বেশি। তাই শখ করে এটা খুলে বসলাম আর আল্লাহর রহমতে মার্কেটেও বেশ সাড়া পেয়ে গেলাম।

-তাই বলে এই ঘন জঙ্গলে ফ্যাক্টরি কেন জাবেদ সাহেব?

-আসলে কি থমাস বাবু, এই জায়গার নামের সাথে আমার পারফিউম ব্র্যান্ডের নামের একটু মিল আছে। তাই এ জায়গাটাই বেছে নিলাম। তবে প্রথম দিকে কর্মচারীরা সাপের ভয়ে এখানে কাজ করতে রাজি হয়নি, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব ভালো করেছি তাই কাজ করতে আর কারো কোন আপত্তি নেই। আসুন আমি নিজে আপনাদের সব ঘুরে দেখাচ্ছি।

আমরা জাবেদ সাহেবের পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। বিশাল ফ্যাক্টরি। আমরা লম্বা করিডোর ধরে হাঁটছি। হঠাৎ এক জায়গায় মেঝেতে জুতার আঘাত লেগে অন্যরকম আওয়াজ হলো। মনে হলো মেঝের নিচে ফাকা। নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড কোন কক্ষ আছে। কিন্তু সামনে দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবার মত কোন রাস্তা তো দেখিনি। মনের ভিতর কিছু একটা নড়ে উঠলো। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। রাত আটটার দিকে আমরা সেনা ক্যাম্পে ফিরলাম। ফেরার পথে ওয়াহিদ সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম,

-আচ্ছা ওয়াহিদ সাহেব, মি. জাবেদকে আপনার কেমন লাগলো?

-নিঃসন্দেহে ভালো মানুষ। যেমন বাচনভঙ্গি তেমনি অমায়িক ব্যবহার। সব মিলিয়ে মাটির মানুষ।

ওয়াহিদ সাহেবের কথা ঠিক কিন্তু তবুও কোথাও একটা ঝামেলার গন্ধ পাচ্ছি। একজন ফরেনসিক বিভাগের নামকরা বিশেষজ্ঞ হঠাৎ পারফিউম তৈরিতে এত আগ্রহ প্রকাশ করছেন কেন? আর নিচে লুকানো আন্ডারগ্রাউন্ডই বা কেন? এর রহস্য আমাকে খুঁজে বের করতেই হবে।

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : লাশ রহস্য (চতুর্থ পর্ব)

রাত একটা বাজে। আমি বিছানা ছেড়ে উঠলাম। কোমরে পিস্তল হোল্ডারে আমার পছন্দের ৭.৬২এমএম পিএসএস সেল্ফলোডিং সাইলেন্ট কিলার পিস্তল গুজে নিলাম। ডান পায়ে গোড়ালির একটু উপরে নাইফ হোল্ডারে শেফিল্ড ফেয়ারবেরিন স্কাইস ডেগার আর বাম পায়ে পিস্তল হোল্ডারে বেরত্তা ৯২এফ এস পিস্তলটাও সাথে নিয়ে নিলাম। আর ডান হাতরে কব্জিতে বেধে নিলাম, চোখে নাইট ভিশন গ্লাস। নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ‘স্নেক ইয়ার্ডে’র দিকে হা৭টতে শুরু করলাম।

আমি দৌড় দিয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠে একটার পেটে প্রচন্ড জোরে লাথি মারলাম আর আরেকটার মাথায় হাতে পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করলাম। সাই করে একটা গুলি আমার কানের কাছ দিয়ে গিয়ে দেওয়ালে বিধলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখি সেনা বাহিনীর হেড কর্নেল জতিন দাস আমার দিকে পিস্তল তাক করে আছে। আমি এক গুলিতে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল উড়িয়ে দিলাম। বিকট চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মি. জাবেদ চৌধুরী। তিনি পিস্তলটা হাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে সে সুযোগ না দিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মি. জাবেদের চোয়ালে ঘুষি বসিয়ে দিলাম। এক ঘুষিতেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন তিনি। সবাইকে দড়ি দিয়ে টাইট করে বেধে ফেললাম।

ওয়াহিদ সাহেবকে ঘরে রেখে এসেছি। খবর দিলে আমি যেখানে থাকবো সেখানে সেনা ফোর্স নিয়ে হাজির হবেন তিনি। তার আগে কেউ যেন জানতে না পারে। আমি ‘স্নেক ইয়ার্ডে’ যাচ্ছি সেটা কাওকে জানতে দেওয়া যাবে না, কারণ ‘স্নেক ইয়ার্ডে’ ঢোকার অনুমতি কোনভাবেই পাওয়া যায়নি। সামনের দিকে সেনা পাহারা থাকায় পেছন দিয়ে অনেকটা ঘুরে ‘স্নেক ইয়ার্ডে’র কাছে পৌঁছালাম।

রাতের দ্বিতীয় প্রহর। আমি নিঃশব্দে ‘স্নেক ড্রাগনে’র পেছনের অভিশপ্ত জঙ্গল ‘স্নেক ইয়ার্ডে’ ঢুকলাম। নিঃশব্দ জঙ্গলে নিজের নিশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। যত ভেতরে যাচ্ছি জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে আসা ভয়ঙ্কর সব সাপের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ হঠাৎ মনে হচ্ছে শুকনো পাতায় খস খস শব্দ করে কোন বিষাক্ত সাপ খুব কাছ দিয়ে চলে গেছে। আমি জঙ্গলের আরো গভীরে ঢুকে যাচ্ছি। একটা বিষয় খুবই রহস্যজনক লাগছে। এত সাপের আওয়াজ কিন্তু এখনো আমার চোখে একটা সাপ ও দেখা দেয়নি। তাহলে কি সব আওয়াজ ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে করা?

জঙ্গলের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই দুজন বিশালদেহী লোক চোখে পড়লো, তাদের পাশেই একটা কাভারভ্যান দাঁড় করানো। ঐসময়ই মনে হল মাটি ভেদ করে আরো দুজন উঠে এলো। দুজনের মাথায় দুইটা বাক্স। কাভারভ্যানে বাক্সগুলো রেখে আবার মাটির নিচে ঢুকে গেল। বুঝতে বাকি রইলো না জঙ্গলের ভেতরের এই সুরঙ্গই ‘স্নেক ড্রাগনে’র আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষে যাওয়ার রাস্তা।

৭.৬২এমএম পিএস সেল্ফলোডিং সাইলেন্ট কিলার পিস্তলটা দিয়ে বাইরে থাকা লোক দুটাকে শুইয়ে দিলাম। সুরঙ্গ দিয়ে ঢুকতে যাবো এমন সময় পেছন থেকে একজন জাপ্টে ধরলো। ধস্তাধস্তি করতে করতে হাতের পিস্তলটা কোথায় ছিটকে পড়লো দেখতে পেলাম না। ডান পায়ে রাখা শেফিল্ড ফেয়ারবেরিন স্কাইস ডেগারটা হাতে নিয়ে লোকটার পেটে গুঁজে দিলাম। লোকটা ধুপ করে মাটিতে পড়ে গেল। এখন পিস্তল খোঁজার সময় নেই। তাড়াতাড়ি সুরঙ্গে ঢুকে পড়লাম।

একটা পিলারের আড়ালে দাঁড়িয়ে বাক্স বহনকারী লোক দুটোর অপেক্ষা করছি। পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি ওদের। কাছাকাছি আসতেই অতর্কিত ঝাপিয়ে পড়লাম। ওরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার ডেগার ওদের গলা দুইভাগ করে দিলো। বাক্সগুলো মেঝেতে আছড়ে পড়তেই একটা ভিতর থেকে মানুষের কঙ্কাল বের হয়ে এলো।

সুরঙ্গের প্রান্তে একটা পিস্তল ভেসে উঠলো। আমি ডাইভ দিয়ে একটা পিলারের আড়ালে চলে গেলাম।ডেগারটা রেখে এবার বেরেত্তা ৯২এফএস পিস্তলটা হাতে নিলাম। তারপর চোখের পলকে সুরঙ্গে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের খুলি উড়িয়ে দিলাম। এবার এক দৌড়ে ‘স্নেক ড্রাগনে’র আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষে ঢুকলাম। দুজন বিশালদেহী লোক আমার দিকে ছুটে আসতে লাগলো।

আমি দৌড় দিয়ে শূন্যে লাফিয়ে উঠে একটার পেটে প্রচন্ড জোরে লাথি মারলাম আর আরেকটার মাথায় হাতে পিস্তলের বাট দিয়ে আঘাত করলাম। সাই করে একটা গুলি আমার কানের কাছ দিয়ে গিয়ে দেওয়ালে বিধলো। মাথা তুলে তাকাতেই দেখি সেনা বাহিনীর হেড কর্নেল জতিন দাস আমার দিকে পিস্তল তাক করে আছে। আমি এক গুলিতে তার পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল উড়িয়ে দিলাম। বিকট চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লেন তিনি। পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন মি. জাবেদ চৌধুরী। তিনি পিস্তলটা হাতে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি তাকে সে সুযোগ না দিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে মি. জাবেদের চোয়ালে ঘুষি বসিয়ে দিলাম। এক ঘুষিতেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন তিনি। সবাইকে দড়ি দিয়ে টাইট করে বেধে ফেললাম।

ডান দিকে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে, ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই, ক্যামিক্যাল আর লাশ গলা গন্ধে প্রায় বমি আসার উপক্রম হলো। ভালো বুদ্ধি করেছিলেন জাবেদ চৌধুরী। উপরের পারফিউম ফাক্টরির  সুগন্ধকে কাজে লাগিয়ে তিনি এই বিশ্রী গন্ধ চাপা দিয়েছেন। জামান ওয়াহিদ সাহেবকে ফোন দিয়ে এখানে ফোর্স নিয়ে চলে আসতে বললাম।

সকাল দশটার মধ্যে বাসায় পৌঁছে গেলাম আমি, ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম টিভির সামনে। টিভির হেডলাইনে বড় করে ভাসছে ‘ব্রেকিং নিউজ : অবশেষে সমাধান হল লাশ চুরি রহস্যের।’

সংবাদ পাঠিকা খুব গুছিয়ে বলতে শুরু করল, গতকাল বান্দরবানে অবস্থিত ‘স্নেক ড্রাগন’ পারফিউম ফ্যাক্টরির লুকানো আন্ডারগ্রাউন্ড কক্ষ থেকে ৭০টি কঙ্কাল ও ৩০টি অর্ধগলিত লাশসহ দেশবিখ্যাত ফরেনসিক স্পেশালিস্ট ডা. জাবেদ চৌধুরী ও সেনা কর্মকর্তা কর্নেল জতিন দাস ও আরো দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তদন্তে জানা যায় যে, ডা. জাবেদ চৌধুরী লাশ থেকে কঙ্কাল বের করে পাচার করতে চেয়েছিলেন। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কাছে কঙ্কাল খুবই প্রয়োজনীয় জিনিস। বাজারে পর্যাপ্ত কঙ্কাল না থাকায় কঙ্কালের দাম চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা। অতিরিক্ত লাভের আশায় তিনি এ ঘৃণ্য কাজ করতে চেয়েছিলেন এবং তার সহযোগী ছিলেন কর্নেল জতিন দাস। এর সাথে সাথে অভিশপ্ত জঙ্গল স্নেক ইয়ার্ডের রহস্য ও সমাধান হয়েছে।

জঙ্গলের ভেতরে ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম দিয়ে সাপের আওয়াজ তৈরি করা হতো, সাহস করে কেউ ঢুকলে তাকে ধরে ডা. জাবেদ চৌধুরীর বাহিনী  সাপের বিষ শরীরে দিয়ে  হত্যা করে জঙ্গলেই ফেলে রাখতো। তথ্য সূত্রে আরো জানা গেছে, বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. থমাস আব্রাহামের সহায়তায়ই পুলিশ লাশ চুরির রহস্যের সমাধান করেছেন।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বেলকনিতে এসে দা৭ড়ালাম, একটা সিগারেট বের করে আবার পকেটে রেখে দিলাম। সকালের স্নিগ্ধ বাতাসকে দূষিত করতে মন সায় দিচ্ছে না। (সমাপ্ত)

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...