লাশ রহস্য (তৃতীয় পর্ব)
লেখক সীমান্ত পিটার গমেজ

সীমান্ত পিটার গমেজ

২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। আমি আর ওয়াহিদ সাহেব সরকারি দফতরের রিপোর্টের অপেক্ষায় বসে আছি। রিপোর্ট আসলো রাত নয়টায়। আজ সারাদিনে মৃত্যুর সংখ্যা সব থেকে বেশি পাবনায়, মোট পঁচিশ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাবনার সব থানায় রেড এলার্ট জারির ব্যবস্থা করলাম।

সব থানায় এই নোটিশ পাঠিয়ে দেওয়া হলো যে, কাল পঁচিশটা লাশ যে যে কবরস্থানে দাফন করা হবে সেই কবরস্থানগুলোর উপর গোপনে নজর রাখতে হবে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই একটা বিশেষ খবর আসলো। পাবনার আটঘরিয়া থানার মতিঝিল গ্রামে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়েছে।

আমি আর ওয়াহিদ সাহেব রওনা হয়ে গেলাম আটঘরিয়ার উদ্দেশ্যে। আটঘরিয়া থানার ওসি নুরুল সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। সন্ধার একটু পরেই আমরা পাঁচ জনের একটি টিম কবরস্থানের পাশের জঙ্গলের বিভিন্ন গাছে পজিশন নিলাম। কবরস্থানে দুজন গার্ডও ছিলেন। ঠিক রাত বারোটার সময় কবরস্থানের পেছনের বাঁশের ঝাড় থেকে ভুতুরে আওয়াজ আসতে লাগলো। গার্ড দুইজন ভয়ে ভূত ভূত বলে দৌড়ে পালালো। আমাদের সবার বুকের ভিতরটাও কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমরা পাঁচ জনই কনফারেন্স কলে একে অপরের সাথে সংযুক্ত। আমি ফিস ফিস করে বললাম,
-আপনারা কেউ ভয় পাবেন না। চোরেরা ভয় দেখিয়ে গার্ডদের সরিয়েছে। সবাই ভালোভাবে লক্ষ্য রাখুন। উল্টাপাল্টা কিছু নজরে পড়লে নিঃশ্বব্দে জানাবেন।

>> এ লেখকের আরো লেখা পড়ুন : লাশ রহস্য (দ্বিতীয় পর্ব)

আমি কথা শেষ করতে না করতেই কবরস্থানের ভিতরে তিনটা টর্চ লাইট দেখা গেল। আলোগুলো যেটুকু জায়গাতে পড়ছে শুধু সেটুকু জায়গাই আলোকিত হচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে বিদেশি কোন কোম্পানির টর্চ লাইট। আমি আবার ফিস ফিস করে বললাম,
-যার যার পিস্তল হাতে নিয়ে নিঃশ্বব্দে গাছ থেকে নামুন, আমার আগে কেউ সামনে আসবেন না।
আমরা সবাই আস্তে আস্তে গাছ থেকে নেমে এলাম। আমি আমার সাথে নিয়ে আসা আমরিকান টর্চটা থেকে সরাসরি ওদের লক্ষ্য করে আলো ফেললাম। কবরস্থানের মাঝখানে চারজন দাঁড়িয়ে আছে। আমার লাইটের আলো পড়তেই তারা ঘাসের উপর শুয়ে পড়লো। আমি চিৎকার করে বললাম,
-কেউ পালাবার চেস্টা করবে না, গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবো।

আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁশ ঝাড় থেকে সাই করে একটা গুলি এসে আমার হাতের টর্চে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে একটা গাছে বিধে গেল। আমি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। কবরস্থানের বাইরেও যে লোক থাকবে এমনটা আশা করি নি। ওয়াহিদ সাহেব পাল্টা গুলি ছুড়তে ছুড়তে জিজ্ঞেস করলেন,
-মি. থমাস আপনি ঠিক আছেন তো।
-হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।

আমরা পাঁচ জনই এলোপাথারি গুলি ছুড়তে লাগলাম। চিৎকার শুনে বোঝা গেল যে দুইটাকে অন্তত ফেলে দিয়েছি। এই ফাঁকে বাকিগুলো পালিয়ে গেছে। ফায়ারিং বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। তারপর সবাই মিলে সাবধানে গেলাম বাঁশ ঝাড়ের দিকে। গিয়ে দেখি বাঁশ ঝাড়ের ভেতরে দুইজন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দুজনই মারা গেছে। তার পাশেই একটা ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম পড়ে আছে। অন করতেই একটা ভুতুরে আওয়াজ বাজতে লাগলো। তাহলে ভূতের আসল রহস্য এই সাউন্ড সিস্টেম। কবরস্থানের ভেতরে মাটি খোঁড়ার কয়েকটা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কিছুই পাওয়া গেলো না।

জীবিত অবস্থায় কাউকে না পাওয়ায় কোন সূত্রই আর হাতে আসলো না। অন্য কোন কবরস্থানে কোন চুরি হয়নি। হয়তো এরাই এই কবরস্থান থেকে অন্য কবরস্থানে যেতো। সে সুযোগটা আমাদের জন্য পায়নি বা এমন ও হতে পারে যারা পালিয়ে গেছে তারা অন্যদের কে সাবধান করে দিয়েছে। অবশেষে খালি হাতেই আমি আর ওয়াহিদ সাহেব ঢাকার দিকে রওনা হলাম। সারা রাস্তা ওয়াহিদ সাহেব আমার সাথে কোন কথাই বললেন না। তিনি যথেষ্ট ভেঙে পড়েছেন।

আমাদের আরো ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যেতে হত। প্রতি পক্ষকে এতটা দুর্বল ভাবা একদমই ঠিক হয়নি। তবে আমি শতভাগ নিশ্চিত, যে বা যারা এই লাশ চুরির পেছনে কাজ করছে তারা ভয় পেয়েছে। আর ভয় পেলেই মানুষ কিছু না কিছু একটা ভুল করে বসে। ওরাও করবে।

লেখক: সভাপতি, ফৈলজানা খ্রিষ্টান যুব সংঘ।

image_printপোস্টটি প্রিন্ট করতে ক্লিক করুন...